আজ বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:৩৪ অপরাহ্ন

ডাক্তার ভাই তোমায় মনে পরে, স্মৃতিচারণে কাইলাকুড়ী ডায়াবেটিস পূনর্বাসন প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক || অরুপ সরকার

আজ ১ সেপ্টেম্বর,২০১৯ ডাঃ এড্রিক সার্জিসন বেকার (ডাঃ ভাই) এর ৪র্থ মৃত্যু বার্ষিকী। ২০১৫ সালে আজকের এই দিনে দুপুর আনুমানিক ১২:৩০ টায় তিনি তার প্রতিষ্ঠিত ‘কাইলাকুঁড়ি হেলথ কেয়ার সেন্টার’ এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ডাক্তার ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে, কাইলাকুড়ী স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রের মেডিকেল সমন্বয়কারী জনাব সুজিত রাংসা এর লিখাটি হুবুহু তুলে ধরছি।

ছবিতে হুইল চেয়ারে বসা তার নাম মোঃ সুলতান আহমেদ (বয়স ৬৫ বছর)।

তার সাথে জড়িয়ে আছে কাইলাকুড়ী ডায়াবেটিস পূনর্বাসন প্রকল্পের ইতিহাস (কে ডি আর পি)।
তিনি আমাদের একজন সিনিয়র ডায়াবেটিস প্যারামেডিক ছিলেন । তিনি কাইলাকুড়ী ডায়াবেটিস পূনর্বাসন প্রকল্পের প্রথম ডায়াবেটিস রোগীও , যাকে কেন্দ্র করে কাইলাকুড়ী ডায়াবেটিস পূনর্বাসন প্রকল্পের সূচনা হয়। মোঃ সুলতান ভাই প্রথম ডায়াবেটিস রোগী হিসাবে থানারবাইদ স্বাস্হ্য কেন্দ্রে আসেন ১৯৮৪ সালে (যেখানে ডাঃ ভাই প্রথম কাজ আরম্ভ করেন )। তার মধ্যে ডায়াবেটিস লক্ষণ গুলি পেয়ে ডাঃ ভাই কৌতুহল হয়ে উঠেন ডায়াবেটিস নির্নয়ের জন্য, কিন্তু কিভাবে ডায়াবেটিস নির্নয় করবে? এই গভীর জংগলের গ্রামের ভিতরে ! শুধু বাধা আর ৰাধা , তখন এই এলাকায় রক্ত পরীক্ষা তো দুরের কথা প্রস্রাব পরীক্ষার জন্য বেনিডিক্টসলিউশনও পাওয়া যেত না। তার পরও তিনি থেমে থাকেননি চেষ্টা চালিয়ে গেছেন ডায়াবেটিস নির্নয়ের জন্য। তিনি সুলতান ভাইয়ের প্রস্রাব একটি কৌটায় তুলে টেবিলের উপর এক কোনায় রাখতেন এবং লক্ষ্য রাখতেন প্রতিদিনই ঐ প্রস্রাবের উপর পিপিলিকা বসে কিনা। তারপর তা কাগজে লিখে রাখতেন। প্রতিদিনই দিনে ৫ বার প্রস্রাব সিদ্ধ করতেন, সিদ্ধ করার পর নীচে জমে থাকা তলানী জিহ্বা দিয়ে চেটে দেখতেন এটা মিষ্টি কিনা । প্রতিদিন রোগীর প্রস্রাব করার ইতিহাস, খাওয়ার ইতিহাস, শুকিয়ে যায় কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি নোট রাখতেন।

একদিন ডাক্তার ভাই এই নোট কাগজগুলো নিয়ে পরিকল্পনা করেন ঢাকায় বারডেম হাসপাতালে যাবেন। তারপর তিনি একদিন ঢাকার উদ্দেশ্য রওয়ানা হলেন। তখন এই এলাকার রাস্তা খুবই খারাপ ছিলো চলাফেরার জন্য যানবাহনও ঠিকমতো পাওয়া যেত না, বাইসাইকেল এবং পায়ে চালিত ভ্যান গাড়ি ছাড়া অন্য কোন কিছু পাওয়া যেতো না। ডাক্তার ভাই খানিকটা পথ বাইসাইকেল খানিকটা পথ ভ্যান দিয়ে লাল কাদামাটির সাথে যুদ্ধ করে রসুলপুরে গিয়ে উঠেন। তারপর বাসে উঠে ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা কাদা মাটিসহ পৌছেন, আনুমানিক বিকাল ৫টার দিকে বারডেম হাসপাতালে যান জাতীয় প্রফেসর ডাঃ ইব্রাহীম স্যারের সাথে দেখা করতে।

দরজা দাড়িয়ে থাকা স্যারের সাহায্যকারীর কাছে অনুমতি নিয়ে ডাঃ ভাই প্রবেশ করলেন, প্রফেসর ডাঃ ইব্রাহীম দেখে সালাম জানালেন বাংলায়। প্রফেসর উনাকে দেখে খুব অবাক হয়েছিলেন। বিদেশী মানুষ এত সুন্দর বাংলায় কথা বলেন আবার সালামও দিলেন সন্মান দিয়ে বলেন আপনি বসুন । কিছুক্ষন কথা বলার পর ডাক্তার ভাইকে প্রফেসর ডাঃ ইব্রাহীম জড়িয়ে ধরে বলেন এত কষ্টকরে ডায়াবেটিস নির্ণয় করেছেন একজন গরীব মানুষের। তিনি বলেছেন কোন মানুষ গরীবের কারনে চিকিৎসা না পেয়ে মরে যাবে এজন্য তিনি বারডেম হাসপাতাল তৈরি করেন নাই। বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ তাদের ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতে পারবে।

ঢাকা থেকে ফিরে এসে তিনি কাইলাকুড়ী ডায়াবেটিস পূর্নবাসন প্রকল্প (কে ডি আর পি) স্হাপন করেন। ডাক্তার ভাই এভাবেই তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন। তিনি সব সময় বলতেন কে ডি আর পি বাবা – মা হলো বারডেম হাসপাতাল। সেই ১৯৮৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বারডেম হাসপাতালের সমাজ কল্যাণ বিভাগ যেভাবে অকাতরে সাহায্য সহযোগিতা করে অাসছে, অামরা খুবই কৃতজ্ঞ। বর্তমানে কে ডি আর পির প্রায় ২০০০(দুই হাজার) জন ডায়াবেটিস রোগী আছে, তাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ (নয়শত) জন রোগী ইনসুলিন নির্ভরশীল, বাকী সব খাবার বড়ি / খাওয়ার নিয়মে তাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করছে। এই প্রোগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় ৫ টি সাবসেন্টার আছে, সাব সেন্টার গুলি দেওয়ার উদ্দেশ্য হলোঃ এই প্রোগ্রামে অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগী তাদের চিকিৎসা খরচ বহন করতে পারেনা, তারা যেন তাদের ডায়াবেটিস চিকিৎসা পায়ে হেটে/ কম খরচে অটো রিকশা / বাই সাইকেলে গিয়ে চিকিৎসা করতে পারে। সাব সেন্টার গুলি প্রতি সপ্তাহে একদিন খোলা হয়। সাব সেন্টার পরিচালনার জন্য কর্মীদল আগের দিন ঔষধ, ইনসুলিন, সুই সিরিন্জ, যাবতীয় কাগজ পত্র, যাবতীয় মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করা হয় তারপর পরের দিন খুব সকালে বাই সাইকেলে যাবতীয় জিনিস নিয়ে সাব সেন্টারে যাওয়া হয়। সারা দিন কাজ করে বিকেলে, মাঝে মধ্যে রাতে কর্মীদল ফিরে আসেন।

সাব সেন্টারে যেসব রোগী ভাই বোনেরা আসেন তাদের জন্যে এক মাসের ইনজেকশন ইনসুলিন,ডায়াবেটিসের বড়ি, অন্যান্য সমস্যার যাবতীয় সব ঔষধ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে দেওয়া হয় ১(এক) মাসের জন্য। ১(এক) মাস পর তাদের আবার ফলোআপ আসতে হয়, এক মাসের মধ্যে কোন সমস্যা হলে তারা যেন কোনদিন আসতে পারবে ডাক্তার অথবা প্যারামেডিক দেখানোর জন্য।

ডায়াবেটিস হলো আজীবনের রোগ এজন্য এই রোগী ভাই বোনদের আজীবন নিয়ম কানুন মানতে হয় এবং নিয়ম কানুন গুলি শিখতেও হয় নিজের আর পরিবারের সদস্যদের। হঠাৎ নিয়ম কানুন গুলি জানা না থাকলে কখনোই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না যেমনঃ খাওয়ার নিয়ম কি? ঔষধ / ইনসুলিন কখন কখন নিবে এবং কি পরিমানে নিবে? শৃংখলা কি? কিভাবে এবং কখন কখন প্রসাব পরীক্ষা / রক্ত পরীক্ষা করতে হয়? কিভাবে এবং কোথায় কোথায় ইনসুলিন পুশ করবে? অনিয়ন্ত্রন হলে কিভাবে ইনসুলিন অাপ-ডাউন করবে? কিভাবে পায়ের যত্ন নিবে? হাইপো গ্লাইসিমিয়া কি এবং লক্ষণ গুলি কি কি? হাইপোগ্লাইসিমিয়া হলে কি খাওয়ানো হবে? প্রসাব পরীক্ষা / রক্ত পরীক্ষা বন্ধ করলে কি হবে? ইনসুলিন/বড়ি বন্ধ করলে এসিড অবস্থা হয়ে মারাও যেতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি সম্পর্কে ধারনা এবং শেখানো হয়। এসব কিছু শিখতে তাদের সময় লাগে এজন্যই ভর্তি হতে হয়।

কে ডি আর পির ভর্তি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১২জন ভর্তি রেখে নিয়ম কানুন গুলি শেখানো হয়। এছাড়াও ডায়াবেটিস হলো আজীবনের রোগ দীর্ঘদিনের কিছু জটিলতা নিয়েও ভর্তি থাকে,যেমনঃ ডায়াবেটিস কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস স্নায়ু রোগ, ডায়াবেটিস চোখের ছানী, ডায়াবেটিস পায়ে ঘা ইনফেকশন, মাঝে মধ্যে ডায়াবেটিস এসিড অবস্হাসহ। ভর্তি অবস্হায় প্রতিদিন দিনে দুইবার তাদেরকে এবং পরিবারের একজন সদস্যকে ডায়াবেটিসের নিয়ম কানুন বিষয়ে এবং সংক্রামক রোগগুলির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় আর সচেতনতা তৈরি করি। আমরা যখন তাদেরকে পুনরায় আগের জীবনে দেই, এভাবে আমরা তাদেরকে পূর্নবাসন করে থাকি।

আজকের এই দিনে কাইলাকুড়ী স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রের ও ডাঃ এড্রিক বেকার মানব কল্যাণ সংঘের পরিবারবর্গ গভীরভাবে শোকাহত এবং ডাঃ ভাইয়ের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন :
সংবাদটি শেয়ার করুন :