আজ বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৫:১২ অপরাহ্ন

আসামের হাসপাতালে প্রবীণ চিকিৎসককে পিটিয়ে হত্যা

কেউ ঘুষি মারছে। কেউ লাথি। কাচের একটা কোপ পড়ল ডান হাঁটুর পিছনটায়। বুঝতে পেরেছিলেন, বিপজ্জনক শিরা কেটে ফিনকি দিয় রক্ত বেরোচ্ছে। রক্ত বন্ধ করতে ব্যান্ডেজ চাইছিলেন। কেউ তা ছুঁড়ে ফেলে দিল। কাঁপতে কাঁপতে চাইছিলেন পানি।

রক্ত মুছতে চান তুলায়। বদলে চলতে থাকে মার। জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত মুখগুলা দেখে বিস্ময় কাটছিল না ভারতের পশ্চিমবঙ্গের টিওক চা বাগানের ডা. দেবেন দত্তের। কারণ যারা তাকে মেরেছে তাদের অনেকের জন্ম তাঁর হাতেই!

চা শ্রমিকদের হাতে নিহত ডা. দেবেন দত্তের মেয়ে জানান, বাবা ১৯৭২ সালে টিওক চা বাগানে যোগ দেন। পরে বিভিন্ন | বাগানে কাজ করলেও মন পড়ে ছিল টিওকেই। ২০০৫ সালে অবসর, নেন। ২০১৪ সালে ফের টিওক চা বাগানে বিনা বেতনে রোগী দেখা শুরু করেন।

ক্রিস্টিনা বলেন, ‘যারা বাবাকে খুন করল, তাদের অনেকের জন্মই বাবার হাতে। নিজের রক্ত দিয়েও অনেক রোগীকে বাঁচিয়েছেন বাবা। যেভাবে শিরা কেটে বাবাকে মারা হয়েছে, তা পাকা হাত ছাড়া সম্ভব নয়।’

ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করছে পরিবার। দ্রুত বিচার চান ফাস্ট ট্র্যাক আদালতে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী পীযুষ হাজরিকা জানান, জেলাশাসক অবিলম্বে ম্যাজিস্টেট পর্যায়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

ঘটনার প্রতিবাদে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের আসাম শাখা ও আসাম ফার্মাসিস্ট সংগঠন মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা পরিষেবা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে।  আইএমএ প্রতিনিধিদল আগামীকাল আসামেও আসবে।

ইতিমধ্যেই পুলিশ ২৬ জন শ্রমিককে গ্রেফতার করেছে।

এর আগে গত ৬ মে ডিব্রুগড়ের ডিকম চা বাগানে গাছ চাপা পড়ে এক মহিলা শ্রমিক মারা গেলে বেধড়ক মার খান চিকিৎসক প্রবীণ ঠাকুর। এখনও আতঙ্কে তিনি।

তাঁর কথায়, ‘‘ঘটনার পরে অনেকে আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু আমি মানসিকভাবে আর ওখানে কাজ করতে তৈরি নই। দেবেনবাবুর উপরে কী চলেছে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারছি।’’

শুধুমাত্র অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসকরাই বাগানের হাসপাতালে কাজ করেন। অন্য কেউ বাগানের হাসপাতালে কাজ করতে আগ্রহী নন।

সিনিয়র পুলিশ অফিসার রোশনি আপারাঞ্জি কোরাতি জানিয়েছেন, “৭৩ বছর বয়সী ডাক্তার দেবেন দত্তকে মারধর করেন চা বাগানের শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, ডাক্তার দত্তর গাফিলতিতেই সোমরা মাঝি নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।”

এই ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, জোড়হাট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ভেতরেই শ্রমিকদের হাতে মার খাচ্ছেন ডাক্তার দেবেন দত্ত। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, দরকারের সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না তিনি।

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের দেওয়া একটা বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, “অবসরের পরেও সেবামূলক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন ডাক্তার দত্ত। যাদের তিনি পরিষেবা দিলেন, তারা পুলিশের সামনে তাঁকে মেরে তার পুরস্কার দিল।” এই বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে, “উন্মত্ত জনতার হাত থেকে গুরুতর আহত ডাক্তার দত্তকে বের করে আনতে প্যারামিলিটারির সাহায্য লেগেছিল। এটাই কি ভারতের ন্যায়বিচার। এটাই কি ভারতে চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের সুরক্ষা। ভারতের ডাক্তারদের কাজের সম্মান আর কেউ করে না।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা ও দ্যা ওয়ালগ

আপনার মন্তব্য লিখুন :
সংবাদটি শেয়ার করুন :