আজ শনিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৯, ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন

পার্কভিউ মেডিকেলের প্রভাষক ডা. প্রিয়াংকার আত্মহত্যা: স্বামীসহ আটক তিন

সিলেট পার্কভিউ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. প্রিয়াংকা তালুকদার শান্তা (২৯) আর নেই। রোববার সকালে নগরীর পাঠানটুলা এলাকায় পল্লবী সি ব্লকের ২৫ নাম্বার বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। তবে, ঘটনাকে স্বামীর বাড়ির লোকজন আত্মহত্যা বলে জানালেও মেয়ের বাবার বাড়ির লোকজন এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডা. প্রিয়াংকার বাবা সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের জালালাবাদ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

এ ঘটনায় বোরবার জালালাবাদ থানা পুলিশ প্রিয়াংকার স্বামী স্থপতি দিবাকর দেব কল্লোল, শ্বশুর সুভাষ চন্দ্র দেব ও শাশুড়ি রত্না রানী দেবকে আটক করে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছেন।

এ ব্যপারে জালালাবাদ থানার ওসি শাহ মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ বলেন, আগেই ডা. প্রিয়াংকার স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেয়া হয়েছিল। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। মামলাও হয়েছে। এখন ময়নাতদন্তের পর ঘটনার আসল রহস্য বলা যাবে।

ডা. প্রিয়াংকা তালুকদার শান্তা জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। এমবিবিএস শেষে তিনি সিলেট পার্ক ভিউ মেডিকেল কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের লেকচারার ছিলেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির উপ-পরিচালক ডা. তন্ময় ভট্টাচার্য্য। তিনি বলেন, ডা. প্রিয়াংকা মারা যাওয়ার কথা শুনেছি। তবে বিস্তারিত কিছুই এখনো জানি না।

ডা. প্রিয়াংকার মৃত্যুর ব্যাপারে সিলেট নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজের ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও তার নিকটাত্মীয় ডা. সায়েদা রুমি বলেন, প্রিয়াংকা ক্যাম্পাসে খুবই এ্যাকটিভ এবং পপুলার একটা মেয়ে ছিল। সে গান গাইতো। আমি যতোটুকু জানি, ওর স্বামী নেসাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিলো। টাকা পয়সা না পেলেই সে প্রিয়াংকাকে মারধর করতো। তারা চাইতো না প্রিয়াংকা আর পড়াশুনা করুক। তারা বলতো- এমবিবিএস তো করছই, এফসিপিএস দিয়ে আর কি করবা? আর পড়াশুনা করতে হবে না। চাকরি করো, সংসারে টাকা পয়সা দাও। এসব করে তার উপর নানা সময়ে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতো।

এদিকে, ডা. প্রিয়াংকার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও।তাদের মধ্যে অধিকাংশই এ ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসাবে মানতে নারাজ। তারা মনে করছেন, নির্মম নির্যাতন ও হত্যা করে তার স্বামী লাশ ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যার নাটক সাজানোর চেষ্টা করেছেন। একইসাথে তারা এ ঘটনায় জড়িতের অভিযোগে ডা. প্রিয়াংকার স্বামী দিবাকর দেব কল্লোলের সর্বোচ্চ শাস্তিও দাবি করেন।

জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মাহমুদা পিংকি তার ফেসবুকে লিখেছেন, একটা মানুষ কতটুকু বাধ্য হলে আত্মহত্যার(?) মত পথ বেছে নিতে পারে!!! নিজের চোঁখকেও বিশ্বাস হয় না। ধীরে ধীরে চোঁখের সামনে এই মৃত্যু দেখেছি। খুব ধীরে ধীরে তিল তিল করে তাকে মারা হয়েছে। প্রথমে তার নিজ সত্ত্বা, মন, মানসিকতার মৃত্যু আর আজ তার দেহের মৃত্যু হয়েছে। তবে এটা কি আদৌ আত্মহত্যা, নাকি খুন??? আর সত্যিই যদি আত্মহত্যা হয়ে থাকে তবে আত্মহননে বাধ্য করাকে কি আমরা খুন না বলে আত্মহত্যার নামই দিবো??? আমরা কি এখনও এতো অসহায়!!! একটা শিক্ষিত মেয়ে কি এখনও এই তথাকথিত শিক্ষিত সমাজে এতোটাই অসহায়!!! উত্তরগুলো হয়তো প্রিয়াংকার জানা ছিলো, হয়তো বা না। এই হ্যাঁ না এর উত্তর আর কোনদিন জানা হবে না।

কাঁদো সবাই, শুধু কাঁদো…. এরচেয়ে বেশি কিছু আর কেউ করতে পারবে না। পৃথিবী তার নিজ গতিতেই ঘুরবে, আর ঘুরবো আমরা সবাই। এই ঘূর্ণনের গতিতে কখন যে এই নাম হারিয়ে যাবে কেউ টেরই পাবে না। কোন একসময় স্মৃতির ধুলো সরিয়ে হয়তো মনে পড়বে Priyanka Priyonti এই নামে কেউ একজন ছিলো, আহা রে… বড্ড ভালো মেয়ে ছিলো। যেখানেই থাক ভালো থাকিস…..

জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক মাহবুবা ফেরদৌস জুঁই তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, অবাক লাগে আজকালকার দিনেও মানুষ এরকম অত্যাচারী লোভী হয়? এত টর্চার করতে পারে তাও আবার দেশের most highly educated একটা মেয়েকে।

দিনের পর দিন শাশুড়ির মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার আর কষ্ট সহ্য করে আসছিলো প্রিয়াঙ্কা আপু।তারপরও সহ্য করে যাচ্ছিলো,হাসিমুখে থাকতো সবসময়।সমস্যা একটাই,উনি খুব নরম type এর মানুষ। গতকাল ও উনার কর্মস্থল পার্কভিউ মেডিকেল কলেজে duty করেছেন সবার সাথে, কেউ কল্পনাও করেনি আজ উনি পৃথিবীতে থাকবেন না।

উনার বিয়ের দিনের চেহারা এখনো মনে হয় আমার, কত সুন্দর মায়াবি একটা চেহারা। সেই আপু এই ৪-৫ বছরে শুকিয়ে কাঁটা হয়ে গেছিলো। ইদানিং আপুর সাথে দেখা হলে প্রায়ই বলতাম ইয়া আপু কি অবস্থা হইছে আপনার। তারা নাকি সব সময় আপুর লুক নিয়েও খারাপ কথা বলতো।অথচ উনার বিয়ের দিন জামাইকে দেখে আমার মনে হইছে ও আপুর একটুও যোগ্য না।

মূর্খরা জ্ঞানীর কদর বুঝেনা। ছোটলোক রা সম্মানী কে সম্মান দিতে জানেনা।অযোগ্য কে বিয়ে করেছিলেন বলেই আপুর জীবনটা নষ্ট হয়েছে।

উনার বন্ধুবান্ধবরা জানতেন বাসায় উনাকে টর্চার করা হয়, প্রায়ই জখম দেখা যেতো গায়ে। মেধাবী ছাত্রী ছিলেন, ঠিকমতো পড়াশুনাও করতে দিতো না ওরা, বাসায় কাজের লোক বিদায় করে দিয়েছিল। তারপরও চাকরি করে ঘরের সব কাজ করে, বাচ্চা সামলিয়ে পড়াশুনা করে এবারের ডিপ্লোমা পরীক্ষার preperation নিচ্ছিলেন কিন্ত পরীক্ষা দিতেই দেয়নি ওরা। এই দুনিয়ায় বিচার আশা করি না,বিচার যিনি করার তিনি ঠিক মতো করবেন।

সুনামগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী এড. জান্নাত আফসানা তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেন, মা দিবসে অকালে ঝরে গেল এক মায়ের জীবন। আমাদের নতুনপাড়ার বাসিন্দা ব্যাংকার ঋষিকেশ তালুকদার মহাশয়ের কন্যা ডা. প্রিয়াংকা তালুকদার শান্তাকে নির্মম নির্যাতন ও হত্যা করে তার স্বামী লাশ ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যার নাটক সাজানোর চেষ্টা করেছেন বলে শান্তার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন।

শান্তা সিলেট পার্কভিউ মেডিকেলের লেকচারার হিসেবে চাকরী করতো। শান্তার লাশ নতুন পাড়ার বাসায় আনলে শোকের ছায়া নেমে আসে। ৩ বছরের অবুঝ সন্তান কাব্য তার মায়ের লাশের পাশে পুতুল নিয়ে খেলা করছে। কি হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একটি মেয়েকে ছোটবেলা থেকে বড় করে ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাবা-মায়ের কি পরিমান কষ্ট হয় তা সবাই অনুভব করতে পারছেন নিশ্চয়ই। ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করার দাবী করছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন :
সংবাদটি শেয়ার করুন :