আজ সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯, ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন,

পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম

বাংলাদেশের অধিকাংশ বন্ধ্যা মহিলা ভুগে থাকেন পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোমে। এই রোগের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হলো, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়া এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ বা মুখমণ্ডলে অতিরিক্ত লোম জন্মাতে থাকা। এই সব রোগীদের অনেকেরই খাবার গ্রহণের তুলনায় ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেকের চুল পাতলা হয়ে যায়, আবার কারো কারো গলায় ও ঘাড়ে চামড়া কালো হতে থাকে। অনেকের মধ্যে বিষন্নতা ভর করে এবং মুখে ব্রণ দেখা দেয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মহিলার ঋতুস্রাব শুরু হলে তার ওভারি গুলোতে অজস্র ডিম্বানু তৈরি শুরু হয়। অনেক ডিম্বানু তৈরি শুরু হলেও প্রকৃতির নিয়মে কেবল মাত্র একটি ডিম্বানু বড় হয় এবং মধ্য মাসিকের সময় ডিম্বানুটি ওভারি থেকে বেরিয়ে পাশের ফ্যা‌লোপিয়ান টিউব এ প্রবেশ করে। একে বলা হয় ওভুলেশন।

কিন্তু পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম এর রোগিদের ডিম্বানু পরিপক্ক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন ওভারি থেকে আসে না। ফলে অনেক ডিম্বানু তৈরি শুরু হলেও একটি ডিম্বানু বড় হয়ে ওভুলেশন হয় না। এই ডিম্বানু গুলো ছোট আকারে রয়ে যায়। যার কারণে এই রোগের নাম পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম।

ওভুলেশন না হওয়াতে প্রজেস্ট টেরন(Progesterone) নামক হরমোন তৈরি হয় না। অথচ টেস্টসটেরন (Testosterone) নামক পুরুষ হরমোন তৈরি হয়। এতে মেয়েটির মাসিক অনিয়মিত হয়ে যায়।

অনিয়মিত মাসিক নিয়ে মেয়েদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই৷ অনিয়মিত মাসিক এবং বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ পলিসিস্টিক ওভারি৷ মেয়েদের হরমোনাল সমস্যার মধ্যে ৫-১০ % এই পলিসিস্টিক ওভারি৷ এই রোগটি যখন অনেক গুলো উপসর্গ নিয়ে দেখা দেয় তখন একে বলা হয় পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম৷ সংক্ষেপে PCOS ৷ চলুন জেনে নেয়া যাক, কারা এই রোগের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে? রোগটির লক্ষণ কী এবং কখন আমরা চিকিৎসকের কাছে যাব?

পলিসিস্টিক ওভারি কী?

নাম থেকে আমরা বুঝতে পারি এটা ওভারি বা ডিম্বাশয়ের রোগ৷ এই রোগে ওভারিতে সিস্ট তৈরি হয়৷ তবে সবক্ষেত্রেই যে এমনটি হবে তা নয়৷ এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা ক্লিনিক্যাল ডায়াগনসিস করে থাকেন।

রোগের লক্ষণ সমূহঃ

১. অনিয়মিত মাসিক

২. কম বা অতিরিক্ত দীর্ঘ পিরিয়ড

৩. মুখে , গলায় বুকে অতিরিক্ত লোম

৪. বেশি ওজন

৫. গলায় কালো ছোপ

৬. চুল পাতলা হয়ে যাওয়া

৭. অতি উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতা।

আরও পড়ুন :  কিশোর-কিশোরীদের যত টিকা

এছাড়াও অতিরিক্ত ওজনের কারণে রোগী ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন এবং রক্তে উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরলজনিত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসতে পারে।

কাদের হয়:

নারীদের রিপ্রোডাকটিভ এইজ বা প্রজননক্ষম বয়সে রোগটি হয়৷ সাধারণত ১৫-৪৫ বছর বয়সে রোগটি বেশি হয়৷

কেন হয়:

এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা না গেলেও, ধারনা করা হয় হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং বংশগতি অন্যতম কারণ৷ যেই পরিবারের কোনো সদস্যদের বিশেষ করে মা বা বোনের এই রোগ আছে তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কিছুটা বেশি৷ মেয়েদের শরীরে অতিরিক্ত এন্ড্রজেন (পুরুষ হরমোন) তৈরি হওয়াকেও এই রোগের কারণ হিসেবে ধরা হয়৷

প্রয়োজনীয় টেস্ট:

যেহেতু টেস্ট গুলোর বাংলা নাম কখনই ব্যবহার করা হয়না, তাই এইক্ষেত্রেও সেই নিয়ম অনুসরণ করা হলো।

  • thyroid function test

-fasting glucose test

-lipid level

-ultrasonogram

-serum FSH / LH

-serum testosterone level

রোগের চিকিৎসা সমূহ:

১. সর্ব প্রথম নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভাস এবং পরিমিত ব্যায়ামের মাধ্যমে আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে আনুন৷ পরিমিত ওজন আপনার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমাবে এবং মাসিক নিয়মিত করতে সাহায্য করবে৷

২. যারা এখনই গর্ভব‌তি হওয়া নিয়ে ভাবছেন না, বিশেষ করে যারা অবিবাহিত তাদের ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বেশ কার্যকরী৷ পিল সেবনে মাসিক নিয়মিত হয়৷ রক্তে পুরুষ হরমনের মাত্রা কমে, অতিরিক্ত লোম এবং ব্রণের সমস্যাও কমে৷

৩. যারা সন্তান ধারণে আগ্রহি বা বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যায় ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ি ovulation inducing drug যেমনঃ clomiphene citrate ( ovulet), FSH প্রেসক্রাইব করে থাকেন৷

৪. Metformin: রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমায় এবং hirsutism বা অতিরিক্ত লোমের সমস্যাও কমায়৷ অনেক সময় metformin এবং clomiphene citrate একসাথে ব্যবহার করা হয়৷

৫. Anti – androgen: পুরুষ হরমোন কমায় ৷ ফলে অতিরিক্ত লোমের সমস্যা কমায়৷ তবে যারা গর্ভধারণে আগ্রহি তাদের জন্য এই ওষুধ নয়৷

৬. surgery: এইক্ষেত্রে চিকিৎসক lapaoscopy এর মাধ্যমে ” ovarian driling ” করে থাকেন৷

গর্ভকালীন অতিরিক্ত সতর্কতাঃ

PCOS এর রোগীর ক্ষেত্রে মিসক্যারিজ, মাতৃত্বকালীন ডায়াবেটিস এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সন্তান প্রসবের মত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

সৌজন্যে : মেডিভয়েস

ডা. মশিউর রহমান (সাদিক)

মেডিকেল অফিসার
জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, দিনাজপুর।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :