আজ সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন,

নাক ডাকা রোগে ঘটতে পারে প্রাণহানি!

আমার এক আত্মীয় এতো জোরে নাক ডাকতেন, যেন ঘরের দরজা জানালার কপাট পর্যন্ত কাঁপতো এ শব্দে। ওই আত্মীয়ের বয়স যখন চল্লিশের কোটায়, তখন তাঁর হার্ট এটাক হয়। ফলে তাঁর বাইপাস সার্জারির প্রয়োজন হয়। বাইপাস করেও নিস্তার মেলেনি। পঞ্চাশের ঘরেই আবার হার্ট এটাক এবং মৃত্যু।

কয়েক বছর আগে একজন মন্ত্রী ছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি যেখানে সেখানে মিটিংয়ে মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তেন। ব্যক্তিগত রেফারেন্স আমি জানি, উনিও সজোরে নাক ডাকতেন। এই মন্ত্রী মহোদয়ও আর বেঁচে নেই। তাঁরও হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে গেছে অনেক দিন হলো।

যেই আত্মীয়ের কথা বললাম, তিনি কিন্তু একটা সেকেন্ড চান্স পেয়েছিলেন,  ওনার বাইপাস হয়েছিল। কিন্তু আমি নিশ্চিত, ওনার প্রচণ্ড স্লিপ এপনিয়া (নাক ডাকার রোগ) ছিল। রোগ সম্পর্কে না জানার কারণে তিনি স্লিপ এপনিয়ার চিকিৎসা করাননি। তাঁর বাইপাস হলেও স্লিপ এপনিয়ার কোন চিকিৎসা হয়নি।
নাক ডাকার কারণ:

ঘুমের সময় আমাদের সব মাসল রিলাক্সড হয়ে যায়। রিলাক্সড হয় আমাদের গলার মাসলগুলোও। গভীর ঘুমে চলে গেলে গলার মাসল রিলাক্স করে কলাপ্স করে গলা দিয়ে লাঞ্চে বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়। এতে লাঞ্চে বাতাস যেতে পারে না।

তখন দুটো জিনিস হয়, অক্সিজেনের স্তর খুব কমে যায় আর ব্রেইন ভাবে যে, কেউ আপনার গলা টিপে ধরেছে এবং রিফ্লেক্সলি এবং সারভাইভাল ইনস্টিংক্টে এড্রেনালিন হরমোন রিলিজ করে। এই দুটোর প্রভাবে আপনার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে যায় সাবকনশাসলি। কিন্তু তা আপনি টের পান না।

এভাবে একজন স্লিপ এপনিয়ার রোগীর ঘুম ভাঙছে প্রতি ঘণ্টায় ৫ থেকে ১০০ বারের মতো। আপনার যদি একরাতে ৪০০ বার ঘুম ভেঙে যায়, আপনার রিস্টোরেশন বলতে কিছু হচ্ছে না। ঘুম থেকে উঠেই আপনার টায়ার্ড লাগে। মাথাব্যথা নিয়ে শুকনা ড্রাই মাউথ নিয়ে ঘুম ভাঙে। সারারাত অস্থির হয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকেন আপনি।

আরও পড়ুন :  লিভার ভালো রাখতে উপযোগী পাঁচটি খাবার

রোগীরা বলেন, ডাক্তার সাহেব, কিভাবে বোঝাবো আপনাকে, সারাদিন কি রকম দুর্বলতা বোধ করি। আর যেখানেই বসছি, ঘুমিয়ে পড়ছি। রাস্তার জ্যামে, মিটিংয়ের মধ্যে। আর সারাদিন ঘুমঘুম ভাব।

তবে সমস্যাটা যদি ঘুমের হতো তাহলেও হতো, কিন্তু তাও না। উপরে উল্লেখ করেছি, প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ থেকে ১০০ বার অক্সিজেন ড্রপ করছে। ব্রেইন এড্রেনালিন হরমোন বের করছে সারভাইভাল রিফ্লেক্সে। প্রতি রাতে যদি কয়েকশো বার এ ঘটনা ঘটে। আর এ অবস্থা যদি চলতে থাকে বছরের পর বছর। তাহলে তা হার্ট, ব্লাড প্রেসার, ব্রেইন আর পুরা শরীরের উপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে। ব্লাড প্রেসার হাই হয়ে যায়, হার্ট ফেইলিউর, হার্ট এটাক, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও পালমোনারি হাইপারটেনশন ইত্যাদির আশঙ্কা অনেক গুণ বেড়ে যায়। অনেকটা অবধারিত হয়ে যায় হার্টের সমস্যা।

সুতরাং যদি আপনার নাক ডাকার সমস্যা থাকে এবং ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা অথবা সারাদিন খুব টায়ার্ড লাগে, তাহলে আপনার স্লিপ এপনিয়া হবার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, অনেক সময় নাক ডাকা ছাড়াও স্লিপ এপনিয়া হতে পারে।

শুধু কার্ডিওলজি না, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্য শাখাগুলোও স্লিপ এপনিয়ার গুরুত্ব বুঝতে পারছে। আজকাল এনেস্থেসিওলজিস্টরাও অজ্ঞান করার ক্লিয়ারেন্স দেয়ার আগে রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছে, আগে স্লিপ এপনিয়ার চিকিৎসা করিয়ে আনার জন্য।

নাক ডাকার রোগ অবহেলা করার মতো ব্যাপার না। এটার ডায়াগনোসিস এবং চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে হয়। অতএব চিকিৎসা নিন।

ডা. রুমি আহমেদ

সাবেক ছাত্র, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ;
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :