আজ সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯, ০৯:১৭ পূর্বাহ্ন,

বাংলাদেশী NGO-র বেতনে কর্মীদের দারিদ্র্য বিমোচন হয় না, স্লোগান বিশ্ব দারিদ্র্য মুক্ত করা !

দারিদ্র্য বিমোচন, আর্ত সামাজিক উন্নয়ন, রুরাল হেলথ কেয়ারের লক্ষে ঘোষিত ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে তৎপর বেসরকারী বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা বা এনজিওদের কর্মকান্ড প্রসঙ্গে অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রায় সংবাদপত্রে পড়েছি। এনজিওদের ঘোষিত উদ্দেশ্য মহৎ হলেও মূলত বিদেশী সাহায্য পরিচালিত এসব এনজিও দারিদ্র্য বিমোচনসহ জাতীয় সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি অর্জনের প্রচেষ্টায় কতটুকু উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। মাইক্রোক্রেডিট এনজিও গুলো বরং সুদখোর মহাজন, লোভী শোষক এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। চাকুরী দেওয়ার নামে দেশের বিপুল যুব গোষ্টীর সাথে প্রতারনা, বেতন বৈষম্য করছে এবং সরকারি পে স্কেলের কোন তোয়াক্কা করছে না। শুধু তাই নয়, এনজিওর আড়ালে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক মূল্যবোধ বিরোধী কর্মকান্ডের জন্যও এসব সংস্থার বিরুদ্ধে অনস্বীকার্য অভিযোগ রয়েছে।

১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও তৎপরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রিলিফ ও মানবিক সাহায্য প্রদানের মধ্য দিয়ে এদেশে প্রথম এনজিও কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে যে কমিটমেন্ট নিয়ে এনজিওগুলো যাত্রা শুরু করেছিল তা থেকে ক্রমান্বয়েই তারা দূরে সরে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বেশ কিছু বিদেশী সাহায্য সংস্থা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গড়ার জন্য বাংলাদেশে আসে। তাদেরই আদলে ও ছত্রচ্ছায়ায় বাংলাদেশেও বেশ কিছু এনজিও গড়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর থেকে এনজিওগুলো সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের পাশাপাশি বিভিন্নভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করে তা বাস্তবাযন করতে থাকে। বিশেষভাবে দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেই বেশিরভাগ সাহায্য আসে বিদেশ থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু বড় ধরনের এনজিও বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেদের সম্পৃক্ত করে ফেলে।
একেকটা এনজিও যেভাবে কর্পোরেট বিজনেস প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে, যে হারে তাদের সম্পদ ফুলে ফেঁপে বাড়ছে তাতে এগুলোকে সেবা সংস্থা নাকি ব্যবস্যা প্রতিষ্ঠান বলা সমীচীন হবে তা বলা দুষ্কর। প্রতিদিন বাড়ছে তাদের লাভজনক ব্যবসার পরিধি। বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়েল এষ্টেট, হাউজিং, মোবাইল ফোন প্রভৃতি লাভজনক ব্যবসায় তারা ক্রমান্বযেই ঝুঁকে পড়ছে।

বাংলাদেশে কর্মরত এনজিওসমূহ তাদের কর্মসূচী বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় অর্থের শতকরা ৯০ ভাগের বেশী পায় বিদেশী সংস্থার কাছ থেকে। বাংলাদেশ সরকারের ফরেইন ডোনেশনস এ্যাক্ট অনুসারে এই অর্থকে বলা হয় ‘বিদেশী অনুদান।’ এনজিওরা নিজস্ব উদ্যোগেই বিভিন্ন দাতা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসব অনুদান সংগ্রহ করে। সরকার এসব সাহায্য অনুদানের চেষ্টা তদবিরের সাথে জড়িত থাকে না। বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন দেশের মিশনসমূহের মাধ্যমে এনজিওগুলো দাতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে। বাংলাদেশে কর্মরত এনজিওগুলোকে এ রকম দানকারী সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা দাতা গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ অক্সফাম, পাথ ফাইন্ডার, কমিউনিটি এইড, এ্যাবরোড, কারিতাস, ওয়ার্ল্ড ভিশন, কেয়ার, সাউথ এশিয়া পার্টনারশীপ, ইউএসএসসি, সেভ দ্যা চিলড্রেন ফান্ড (ইউকে), সেভ দ্যা চিলড্রেন ফান্ড (ইউএসএ), সেভ দ্যা চিলড্রেন ফান্ড (অষ্ট্রেলিয়া), আগাখান ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ পপুলেশন এ্যান্ড হেলথ কনসোর্টিয়াম (বিপিএইচসি), কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপম্যান্ট এজেন্সী (সিডা) লোক্যাল ফান্ড ম্যানেজমেন্ট অফিস (সিডা-কানাডিয়ান হাই কমিশন), ডানিডা, নোভা কনসাল্টেন্সী বাংলাদেশ (এনসিবি), জাপানীজ রেডক্রস, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস এ্যান্ড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সী (সিডা), সুইজ এজেন্সী ফর ডেভেলপমেন্ট এ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি), ইউএস এইড, নোরাড প্রভৃতি।

আবার বাংলাদেশ অনেক বড় এনজিও স্থানীয় ছোট ছোট এনজিওকে অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে। যেমন ব্র্যাক, প্রশিকা ইত্যাদি। আইনগত দিক থেকে এতে কোন বাধাও নেই। এনজিওগুলোর প্রধান কাজ জনসেবা। কিছু এনজিও প্রতারণামূলক কাজও করছে। উন্নয়নের নামে তারা যা করছে এবং বলছে তা সবই ফাঁকা বুলি। তারা ঋণ করে গরিবকে ঘি খাওয়ানো শিখাচ্ছে। অন্যদিকে চাকুরী দেওয়ার নাম করে চলছে অদ্ভুত প্রতারণা। অতীতে কোনো সরকারকেই এনজিও কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ কিংবা টু শব্দটি করতে শোনা যায়নি। এনজিওগুলোকে সাধারণ মানুষ সরকারের উন্নয়ন সহযোগি হিসেবেই ধরে নিয়েছে।

আরও পড়ুন :  ঢাকায় ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগ

দাতা সংস্থাগুলোর কাছে সরকারের চাইতে এনজিওগুলোর অধিক গুরুত্ব পাওয়ায় অনেকের কাছেই এ ধারণাটি বদ্ধমূল হয়েছে। দাতা সংস্থার কথা বাদ দিলেও অতীতে ক্লিনটন, টনি ব্লেয়ার বাংলাদেশ সফরে এলে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে পড়ে যে, তাদের কাছে সরকারের চেয়ে এনজিওগুলোই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০০২ অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমানের অভিমান ও ক্ষোভ মিশ্রিত একটি উক্তি থেকে বিষয়টি ধরা পড়ে। অর্থমন্ত্রী কিঞ্চিত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন-‘তারা এনজিওকে এত বেশি গুরুত্ব দেন যে বিদেশ থেকে কেউ এলে আগেই ব্র্যাকের স্কুল দেখতে ছুটে যান। এনজিওগুলোকে তারা দশ ঘন্টা সময় দিলেও সরকারকে দু’ঘন্টা সময় দেন না।’

১৯৯৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত শুধু বেসরকারী সাহায্য হিসেবে এদেশে এসেছে আনুমানিক ১৪ হাজার কোটি ডলারের বেশী কিংবা কম। যার ৭৫% ভাগই গেছে চাটাদের পকেটে। মাত্র ১৫-২০ ভাগ ব্যয় হয়েছে এদেশের গরিব মেহনতী মানুষের জন্য। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য আমাদের অর্থনীতিকে কোন ইতিবাচক ভূমিকা রাখেনি কিংবা দারিদ্র বিমোচনের মত কোন ঘটনা ঘটায়নি।

এক শ্রেনীর কর্মকর্তা সরকারী দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজসে প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করে নিজেরা আখের গুছায়। প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বেতন-ভাতা ছাড়াও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার পাশাপাশি প্রকল্পের কাজে কোন প্রকার তদারকি না থাকার ফলে যেমন ইচ্ছা তেমন করে যাচ্ছে। দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীর সহায়তায় বিদেশ থেকে আনা কোটি কোটি টাকার ডলার ইউরো লুটপাট করে খাচ্ছেন। বিগত কয়েক বছর ধরে এই লুটপাট চলছে বিরামহীনভাবে, বাধাহীনভাবে।

এখানে একটি বেতন স্কেলের উপাত্ত দিলাম আপনাদের বুঝার সুবিধা জন্যঃ
চেয়ারপারসনঃ ১০ লক্ষ (সম্মানি)
প্রজেক্ট ম্যানেজারঃ ২ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ (চেয়ারপারসনের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে কিংবা মেয়ে জামাই)
সহকারী প্রজেক্ট ম্যানেজারঃ ১.৫ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ ( কোন নিকটাত্মীয় )

মাঠ পর্যায়
বেতন শুরু আপ টু ৫০ হাজার
এর পর সহকারী, সহযোগী, পিয়ন, আয়া
৩ হাজার থেকে ২০ হাজার।

এখানে দেখুন বেতন বৈষম্য কেমন! সব কাজ মাঠ পর্যায়ের জনবলই করে থাকেন। যে সকল এনজিও তে বেতন বৈষম্য বেশী সেই গুলোর মধ্যে ব্র্যাক, আশা, সাজেদা ফাউন্ডেশন, সেভ দ্যা চিলড্রেন অন্যতম।
অনেক এনজিও তাদের কর্মীদের কাজের বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক দেয়, তাতে তাদের ফিল্ড লেভেলের কর্মীদেরই দারিদ্র্য বিমোচন হয় না! তাহলে ভেবে নিন, গরিব জনসাধারণের দারিদ্র্য বিমোচনের কি অবস্থা।
এসব এনজিও-ই আবার লেবাস ধরে যে তারা বিশ্বকে দারিদ্র্য মুক্ত করতে চায়! সেটা কি করে সম্ভব ?

এই এনজিও গুলো সরকারী বেতন স্কেল বলুন, ন্যাশনাল ইন্টারন্যাশনাল কোন লেবার আইনের তোয়াক্কা করে না। দেশের শিক্ষিত বেকার সমাজকে মুলা ঝুলিয়ে, সমাজকে সরকার কে মিডেল ফিংগার দেখিয়ে চলছে এই এনজিও গুলো।

ভুঁইফোঁড় ও ভূয়া এনজিও যাতে কোনক্রমেই ফাঁক-ফোকর গলিয়ে রেজিষ্ট্রেশন না পায় সে বিষয়টি সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়টি নিশ্চিত হতে প্রয়োজনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। এনজিও প্রতিষ্ঠায় অতি উৎসাহী উদ্যোক্তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। তারা আসলেই কি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন চাচ্ছেন না কি নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন চাচ্ছেন তা খতিয়ে দেখতে হবে। এনজিও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থ, নির্মোহদের অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। এনজিওগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে সরকারকে ভেবে দেখা সমীচীন।

বিঃ দ্রঃ এই লিখাটিতে বিভিন্ন তথ্য ইন্টারনেট ও নিউজ পেপার থেকে নেওয়া।

Writer : Dr. Syed J Hossain
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা কর্মী।
ডিপ্লোমা চিকিৎসক পেশাজীবী নেতা ও সুলেখক।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :