আজ শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

সরকারি হাসপাতালের নিত্যদিনের গল্প

দিন শেষে রোগী চরম বিরক্ত। কারণ সিট না পাওয়ায় তার স্থান হয়েছে মেঝেতে। এছাড়া এমন এক রুমে তাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, যে রুমের পাশের দেয়ালটা স্যাঁতসেঁতে। বিছানার ফোমটা এবং বাথরুমও নোংরা। এর পরে আবার ভর্তির পর গত তিন ঘণ্টায় ডাক্তারের দেখা মেলেনি। এসব কারণে এখানে এক মুহূর্তও তার থাকতে মন চাইছে না। কিন্তু যাওয়ার তো উপায় নেই।

রোগীর স্বজনেরা বিরক্ত। স্বাভাবিকভাবেই হাসপাতালে তাদের থাকার জায়গা নেই। ওয়ার্ডে প্রতিবার ঢুকতে দারোয়ানকে টাকা দিতে হয়। নার্সকে কিছু বললেই ঝাড়ি দেয়, পরীক্ষা কেন করানো হয়নি, তাই ডাক্তার বকা দিয়ে গেছে।

নতুন জায়গা, এক এক পরীক্ষা এক এক জায়গায়। সব সে চিনেও উঠতে পারেনি। এক্সরে করতে রোগীকে ওয়ার্ড থেকে নেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন। কিন্তু ট্রলি নাই। দুই ঘণ্টা পর ট্রলি মিললেও ওয়ার্ডবয় টাকা চায়।

ওয়ার্ডভর্তি মানুষ থাকার কারণে মিডলেভেল ডাক্তার বিরক্ত। রোগীর অ্যাটেনডেন্সদের জন্য তার কাছে যাওয়াই কঠিন, এক রোগী দেখার সময় আরও পাঁচজন এসে কানের সামনে হাউকাউ করছে। মেঝেতে বসে রোগী দেখতে দেখতে কোমড় ব্যথা হয়ে গেল।

রোগীর অবস্থা খারাপ, পাঁচ ৫ ঘণ্টা আগে পরীক্ষা লিখে দেওয়া হয়েছে। অথচ পরীক্ষা না করিয়ে সেই কাগজ হাতে নিয়ে রোগীর লেকজন বসে আছেন। স্যার নির্ঘাত রাউন্ডে আজকে ঝাড়তে ঝাড়তে অবস্থা খারাপ করে ফেলবে।

ইন্টার্ন এখনো সুগারটা চেক করেনি, ফ্রেশঅর্ডারও বাকি। ইন্টার্ন ডাক্তার বিরক্ত, গত চার ঘণ্টায় শ্বাস ফেলার সুযোগ পায়নি। রাত পৌনে দশটা বাজে। ১০টায় ডিউটি শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ভাইয়া এসে একগাদা কাজ দিয়ে গেছেন। সঙ্গে কিছু কাজ বাকি থাকায় ঝাড়িও দিয়েছেন।

আরও পড়ুন :  পল্লবীতে বিস্ফোরণে দগ্ধ ৯, ঢামেকে ভর্তি

এত এত রোগীর কারণে নার্সও বিরক্ত। বারান্দায় ফ্লোরে বসে মোবাইলের আলোয় একটু আগে একটা রোগীর ক্যানুলা করে এসেছেন। বাথরুম থেকে এসে সেলাইনের লাইনে রক্ত উঠছে বলে সেই রোগী এখন আবার রুমে এসে দাঁড়িয়ে আছে।

এদিকে সংকটাপন্ন এক রোগী আসায় ডাক্তার বারবার ডাকছেন। নিজের বাচ্চাটারও জ্বর, তাড়াতাড়ি বাসায় যাওয়া দরকার ছিল। কিন্তু যাওয়া কি সম্ভব হবে? ওয়ার্ডে ১৬০টা রোগী, বেডে বেডে ঔষুধ দেওয়া যে এখনো বাকি।

ওয়ার্ডবয় বিরক্ত ট্রলি নিয়ে। কারণ রোগী টানার পর কেউ টাকা দিতে চায় না। সে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত না। মাসে ৩ হাজার টাকা বেতন পান। তাই রোগীর স্বজনরা টাকা না দিলে চলবে কেমনে?

হাসপাতালে কোনো বেড খালি নেই। বেড বেচে টাকা খাওয়ার উপায় নাই। যাও একটার কাছে টাকা চাইছে সে আবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে বিচার দিয়েছে, ডাক্তার ডেকে নিয়ে তারে ধমক দিয়েছে!

দিন শেষে ক্লান্ত একদল লোক অপ্রাপ্তির হতাশা নিয়ে ঘুমিয়ে পরে এমন আরেকটি দিনের অপেক্ষায়। একটি অপরিকল্পিত জনসংখ্যার দেশের সরকারি হাসপাতালের নিত্যদিনের গল্প এটি।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :