আজ শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

ডাক্তারের প্রকৃত সংজ্ঞা সেতো অনেক ডাক্তারই জানেন না, জনসাধারণ জানবে কি করে !

 

চিকিৎসক ও ডাক্তার এ দু’টি শব্দই বিশেষ্য পদ। সেইসাথে সমার্থক শব্দ। স্থান-কাল-পাত্রভেদে চিকিৎসক ও ডাক্তার শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বাংলা ভাষাভাষীর লোক চিকিৎসকদের ‘ডাক্তার’ বলে সম্বোধন করেন।

 

 

এ্যালোপ্যাথিক মেডিকেল সায়েন্সে স্নাতক সমমান ডিগ্রিধারী চিকিৎসককে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘ডাক্তারের সংজ্ঞা কি’ ? তিনি বলবেন স্নাতক এমবিবিএস যারা মূলত তারাই ডাক্তার ! যদি তাকেই জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আচ্ছা স্নাতক এমবিবিএস ডিগ্রি ব্যতীত অন্য আর কোন কোন প্রফেশনাল চিকিৎসক, ডাক্তার উপাধি পরিচয় দিতে পারবেন’ ?
সম্ভবত তিনি এবার আর প্রশ্নের উত্তর দেবেন না। চুপ হয়ে থাকবেন। বিষয়টি এমন হতে পারে যে, তিনি এবিষয়ে অজ্ঞ, আবার এমনও হতে পারে তিনি এবিষয়ে সম্যক জ্ঞাত হওয়ার পরও ইচ্ছে করেই দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর টা এড়িয়ে যাবেন। কারণ তিনি বা তার সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য প্রফেশনাল চিকিৎসককে তিনি ডাক্তার মানতে নারাজ। এই যখন দেশের এ্যালোপ্যাথিক গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকের মনোজগতের ভাবনা তখন ডিপ্লোমা কিংবা স্নাতকধারী অন্যান্য প্রফেশনাল দন্ত, হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী, আয়ুর্বেদিক, ফিজিওথেরাপি ও পশু চিকিৎসকের অবস্থা কি হবে ?

যেসকল দেশে মেডিকেল সায়েন্সে ব্যাচেলর অব মেডিসিন এন্ড ব্যাচেলর অব সার্জারি এমবিবিএস নামে কোনো স্নাতক ডিগ্রি নেই, হয়তো সেটা অন্য কোন নামে ( যেমন; বিদেশের স্নাতক ডক্টর অব মেডিসিন এম.ডি ডিগ্রি ) তাদের অবস্থা কি হবে ?

একই সাথে প্রশ্ন উঠবে ব্রিটিশ- পাকিস্তান পিরিয়ডের মেডিকেল কাউন্সিল নিবন্ধিত লাইসেন্সশিয়েট অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি এলএমএফ, মেম্বার অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি এমএমএফ সমমান ডিপ্লোমাধারীরা কি অচিকিৎসক বা হাতুড়ে ছিলেন ?

 

 

 

আধুনিক এ্যালোপ্যাথিকের জয়কার যুগ অষ্টাদশ শতক থেকে বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত যখন এদেশে মেডিকেল কলেজ কিংবা এমবিবিএস কোর্স ছিল না তখন তো এসকল এলএমএফ, এমএমএফ সমমান ডিপ্লোমাধারী ডিপ্লোমা চিকিৎসকগণই ঔপনিবেশিক আমলে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা দিতেন। কালের এই আবর্তনে এসে চিকিৎসা সেবায় তাদের সেই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা অস্বীকার করে তাদের অচিকিৎসক বা হাতুড়ে আখ্যা দেয়া কি উচিত ? তাদের প্রত্যেকের কবর বা চিতার উপর অচিকিৎসকের সাইন বোর্ড লাগিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের কি বলা উচিত তারা ডাক্তার ছিলেন না ? ডাক্তারের একটি বৈষম্যমূলক সংজ্ঞা না দিলেই কি নয় ?

 

 

 

এইতো কয়েক বছর আগের কথা আমি আর আমার বন্ধু যে কিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর অব ইউনানী মেডিসিন এন্ড সার্জারি বিইউএমএস পাশ। দুজনে পাবলিক হেলথ্ সায়েন্সে ২০১৩ সালে সবেমাত্র পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এমপিএইচ ডিগ্রি অর্জন করেছি। দুজন মিলে এক বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে এক আত্মীয় রোগীকে নিয়ে গিয়েছিলাম। উক্ত প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ এক চিকিৎসকের কাছে আমার বন্ধু ডাক্তার পরিচয় দিতেই হতবিহ্বল চোখে উনি (বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) বলে উঠলেন, অল্টারনেটিভ মেডিসিনের স্নাতকধারী চিকিৎসকগণ ডাক্তার উপাধি ব্যবহার করতে পারেন কিনা তিনি তা জানেন না ! এবার বুঝেন ঠ্যালা !

 

 

 

তিন বছর পূর্বের আরেকটি ঘটনা বলি। প্রত্যন্ত এলাকার ইউনিয়নের এক বাজারে বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বিএম&ডিসি নিবন্ধিত এক ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি ডিএমএফ ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী ডিপ্লোমা চিকিৎসক ডা. আনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে চেম্বার প্র্যাকটিস করেন। এলাকার মানুষকে প্রায় বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা দেন। অসুখে বিসুখে এলাকার সবাই রাত- বিরাত আনোয়ার ডাক্তারের কাছে ছুটেন। কিন্তু এতে বাঁধ সাধলেন এলাকার মোড়লের ছেলে বিডিএস ডেন্টিস্ট। তিনি ঢাকায় চেম্বার প্র্যাকটিস করেন। ঈদের ছুটিতে এলাকায় যেয়ে জনসম্মুখে অপপ্রচার করে দিয়ে আসলেন আনোয়ার সাব ডাক্তার নন। অর্থ্যাত ডেন্টিস্টের কথায় আনোয়ার সাব ভুয়া ডাক্তার! আর এজন্য এলাকার গরিব কৃষক রহিম মিয়া তার ১৭ বছরের ছেলে সন্তানকে ক্ষ্যাপা কুকুর কামড় দেয়ার পর ভুয়া ( ডেন্টিস্ট কর্তৃক ঘোষিত ) আনোয়ার ডাক্তারের নিকট না যেয়ে ওঝা, বৈদ্য ও তান্ত্রিকের চিকিৎসার পেছনে ছুটে ছিলেন। ঝাড়- ফুঁক- পানিপড়া, লবনপড়া, তাবিজ-কবচ সর্বশেষ রোগীর পেটের উপর গরম গ্লাস চালানে ছেলেটা পরপারে চলে গেছে। তার জলাতঙ্ক রোগ হয়েছিল।
এবার এটাকে কি বলবেন ? একজন ডেন্টিস্ট যে কিনা ডাক্তার, তার ম্যালকথার জন্য ছেলেটা পরপারে হারিয়ে গেছে !

 

 

কে চিকিৎসক আর কে চিকিৎসক নন, সেটা দেখার জন্য এদেশে আইন আছে, সর্বোচ্চ আদালত আছে তারপরও কেন এ বিষয়টি নিয়ে আপনি মিথ্যাচার করবেন ?
মানলাম, চিকিৎসা পেশায় জেলাস বেশী। এখানে বড় ডাক্তার ছোট ডাক্তারদের উপর জেলাস করে। তাই বলে অপপ্রচার ? বড় ডাক্তার যদি ছোট ডাক্তারদের প্রতি আন্তরিক না হন, ছোট ডাক্তার কি করবে সম্মান বড় ডাক্তারদের ? আপনারা ডাক্তাররা নিজেরাই নিজেদের নিয়ে যা শুরু করছেন তা আল্লাহ্ই একমাত্র মালুম! এরপরও আবার রোগীর শ্রদ্ধা, ভক্তি কিংবা পাবলিকের সম্মান প্রত্যাশা করা কতটুকু যুক্তি সংগত ?

আরও পড়ুন :  দেড় হাজার শয্যায় উন্নীত হচ্ছে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল

 

 

 

আপনার তো বোঝা উচিত ডাক্তারি পেশা একটি মানবিক পেশা। আপনি রোগীর প্রতি এমন মানবিক হবেন যে, আপনার রোগী সুস্থ না হলেও মনে করবেন আপনি তার রোগ সারানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, করছেন। আপনার নিচের সাঁরির ডাক্তারদের প্রতি, রোগীর প্রতি, মনুষ্য সন্তানের প্রতি অমানবিক হওয়া কি উচিত ? কেন হবেন এমন অমানবিক ? আপনার টাকা কামানের ধান্দায় ছোট ডাক্তার বাঁধ সাধে ? ডাক্তারি পেশা কি স্রেফ টাকা কামানের জন্য ? যার যার জায়গা থেকে জনগণের চিকিৎসা সেবা দিলে দোষ কি ? কোনো ডাক্তার প্রেসক্রিপশন প্যাড কিংবা ভিজিটিং কার্ডে ডাক্তার উপাধি প্রিফিক্স ডা. লেখে পদবি কিংবা স্বীকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণ লেখলে তো সবারই বোঝতে পারার কথা সে কোন মাপের ডাক্তার, কোন শাস্ত্রের ডাক্তার। এতে জেলাস ফিল করার কি আছে ?

 

 

 

পল্লী চিকিৎসক, গ্রাম্য ডাক্তারেরও প্রয়োজন আছে। উনারা বনে-জঙ্গলে-হাওর-চরে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ১০ কি: মি: পথ হেঁটে যেয়ে রোগীকে ( যে সকল রোগী বিভিন্ন কারণে স্বাস্থ্য কেন্দ্র আসতে পারে না ) প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কিংবা বড় ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রোগীর শরীরে ইঞ্জেকশন পুশ করে আসে। আপনি ডিপ্লোমা/ গ্র্যাজুয়েট পাশ ডাক্তার হয়ে ওখানে যেয়ে দিয়ে আসবেন রোজ রোজ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কিংবা ইঞ্জেকশন ? চটি মার্কা বইয়ের পাতায় এসব কাহিনী লেখা থাকে না। বড় বড় বই পড়তে হবে। বড় বড় ক্লাশ পড়তে হবে। তবেই এসব জানতে পারবেন।
অতএব কাউকে অবহেলা করবেন না। প্রয়োজনের তাগিদেই অনেক কিছুর গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
সমগ্র স্বাস্থ্য সেক্টরের আজকের অবস্থানের জন্য কোনো একশ্রেণীর স্বাস্থ্যকর্মীই কেবল কাজ করে নি। এ অর্জন সকল স্বাস্থ্যকর্মীর।

 

মানলাম আপনি বড় ডাক্তার, আপনাকেও মানতে হবে মহৎ ডাক্তারি পেশা কোন চটি মার্কা সাহিত্য নয় যে, যখন যা খুশি ঠিক সেভাবে আপনার মনগড়া কোন কিচ্ছা কাহিনী বানিয়ে বানিয়ে বলে পার করে দেবেন। আপনাকে ডাক্তারের প্রকৃত সংজ্ঞা যেমন জানতে হবে, তেমন জীবনের সকল ক্ষেত্রেই একজন মানবিক ডাক্তার হিসেবে সর্বোত্তম মানবিক গুণাবলীর পরিচয় দিতে হবে। কোন সত্য ঘটনা আড়াল করে মানুষকে বিপদগ্রস্ত করা ডাক্তারের কাজ হতে পারে না।

 

 

 

আলোচনার এ পর্যায়ে এসে এবার আমরা জানবো চিকিৎসক বা ডাক্তার উপাধি- টাইটেল ব্যবহারের রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা কি কি :

এ্যালোপ্যাথিক বিএমডিসি এ্যাক্ট’ ২০১০ বলেছে চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসা বিদ্যায় ন্যূনতম স্নাতক এমবিবিএস/ বিডিএস ডিগ্রি ব্যতীত অন্য কেউ ডাক্তার উপাধি ব্যবহার করতে পারবেন না ( ধারা ২৯ এর উপধারা ১ )।

( এর বাইরে বিদেশের স্নাতক এম.ডি ডিগ্রিধারী যারা বিএমডিসি কর্তৃক নিবন্ধিত হয়ে বাংলাদেশে প্র্যাকটিস করেন তারা নামের পূর্বে ডাক্তার প্রিফিক্স ডা. লেখার অনুমোদন প্রাপ্ত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত অল্টারনেটিভ মেডিসিন হোমিও- ইউনানী- আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কর্মকর্তাগণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিসিয়াল আদেশ মারফত নামের পূর্বে ডাক্তার প্রিফিক্স ডা. লেখার অনুমোদন প্রাপ্ত, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ মোতাবেক ফিজিওথেরাপি শাস্ত্রে ব্যাচেলর- স্নাতক ডিগ্রি সমমান ধারীরা নামের পূর্বে ডাক্তার প্রিফিক্স ডা. এবং নামের পরে সাফিক্স পি.টি লেখার অনুমোদন প্রাপ্ত, হোমিওপ্যাথিক প্র্যাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স আইন অনুযায়ী হোমিওপ্যাথিক ডিপ্লোমা ডি.এইচ.এম.এস ধারীরা নামের পূর্বে ডাক্তার প্রিফিক্স ডা. লেখার অনুমোদন প্রাপ্ত, সর্বোচ্চ আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ মোতাবেক বিএম&ডিসি’র পঞ্চম তফসিল নিবন্ধিত ডিএমএফ ডিপ্লোমা ডাক্তারগণ নামের পূর্বে টাইটেল ডাক্তার প্রিফিক্স ডা. ব্যবহার করার অনুমোদন প্রাপ্ত, এবং রয়েছেন স্নাতক ডিগ্রি সমমান ধারী পশু চিকিৎসক যারা ভেটেরিনারি কাউন্সিল কর্তৃক নিবন্ধিত হয়ে নামের পূর্বে ডাক্তার প্রিফিক্স ডা. লেখার অনুমোদন প্রাপ্ত )

সেই সাথে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শাস্ত্রের ডিপ্লোমাধারী ডিইউএমএস, ডিএএমএস ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকগণ তবীব বা হাকীম ও র্বেদ বা কবিরাজ উপাধি ব্যবহার করে থাকেন। আরবি ‘তবীব’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘চিকিৎসক’ যিনি ইউনানী চিকিৎসা শাস্ত্রের পন্ডিত। একই ভাবে সংস্কৃত ‘র্বেদ’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘চিকিৎসক’ যিনি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শাস্ত্রের পন্ডিত। সেইসাথে আরবি হাকীম শব্দের অর্থ যেমন ইউনানী চিকিৎসক নির্দেশ করে তেমনি মৈথালী ভাষার কবিরাজ শব্দের অর্থ আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক নির্দেশ করে।

 

 

 

প্রত্যেক শাস্ত্রের প্রত্যেক ক্যাটাগরির চিকিৎসকদের মনে রাখতে হবে যে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, নাতো আইন দ্বারা বলবৎকৃত কোনো সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। জোর করে কারো উপর আইন চাপিয়ে দেয়া যায় না। আইনের চোখে সবাই সমান।

 

 

লেখক : ডা. এম. মিজানুর রহমান (জনস্বাস্থ্যবিদ)

ডিপ্লোমা চিকিৎসক পেশাজীবী নেতা।
পোস্ট গ্র্যাজুয়েট জনস্বাস্থ্যবিদ পেশাজীবী নেতা।
আইন শাস্ত্রের শিক্ষার্থী ও সুলেখক।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :