আজ শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের এমবিবিএস করান, গ্রামে চিকিৎসার লাইফবন্ড সই করতে রাজি

 

মেডিনিউজ রিপোর্ট :
গ্রামে বার বার এমবিবিএস চিকিৎসক পদায়ন করা হলেও কিছু দিন পর তারা তদবির করে বদলি, প্রেষণ, লিয়েন, ওএসডি কিংবা শিক্ষাছুটি নিয়ে আবার শহরে চলে আসেন। যে কারণে গ্রামের মানুষ উন্নত চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ সাধারণ জনগণের। এর কি সমাধান হতে পারে কিংবা কিভাবে গ্রামের মানুষের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল এসোসিয়েশন বিডিএমএ’র কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের মহাসচিব ও প্রভাবশালী নেতা ডা. সিরাজুল ইসলাম বাচ্চুর কাছে।

 

 

ডা. বাচ্চু বলেন, ‘গ্রাম কিংবা ইউনিয়নে এমবিবিএস গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকগণ কাজ করতে অনিচ্ছুক। কারণ কিছু কিছু গ্রামের অবকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। এখানে নেই কোন ভাল মানের রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, গ্যাস, বসতবাড়ি সহ আধুনিক দৈনন্দিন জীবন যাপনের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। শহরের বিদ্যাপীঠ থেকে সদ্য এমবিবিএস পাশ করা চিকিৎসকগণ নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে গ্রামে যেয়ে প্রথমেই বিভিন্ন সমস্যায় পড়েন। গ্রামের শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও লেখাপড়া না জানা মানুষের সাথে অবাধ মেলামেশায় তারা হিমসিম খান। গ্রামের উঁচুনিচু মেঠোপথে চলতে তাদের অসুবিধা হয়। একারণে গ্রামের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বার বার স্নাতকধারী চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েও কমিউনিটির জনগণের উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। এর বিকল্প উপায় হতে পারে মেধাবী ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের এমবিবিএস কোর্স করিয়ে শর্তসাপেক্ষে গ্রামে নিয়োগ দেয়া। যাতে করে এসকল চিকিৎসক তদবির করেও উপজেলার বাইরে বদলি বা স্থানান্তরিত হতে না পারেন। ব্রিটিশ- পাকিস্তান পিরিয়ডে চিকিৎসা বিদ্যায় লাইসেন্সশিয়েট অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি এল.এম.এফ, মেম্বার অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি এম.এম.এফ ডিপ্লোমা সমমান চিকিৎসকদের জেলা বোর্ডের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়োগ দেয়া হতো। সংশ্লিষ্ট জেলাতেই তাদের নিয়োগ- বদলি চলতো। উপজেলা, মহুকুমা, জেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র সমুহের আবাসিক কোয়ার্টারে এসকল চিকিৎসকগণ সপরিবারে থাকতেন। তাদের ছেলেমেয়েরা স্কুল পর্যায়ে সেখানেই লেখাপড়া করতো। ফলে প্রাইমারী স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে জনগণ চিকিৎসার সুফল পেত।

তৎকালিন পূ্র্ব পাকিস্তান- বাংলাদেশ সরকার ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত স্যার সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজে ( প্রাক্তন ঢাকা মেডিকেল স্কুল) ব্রিটিশ- পাকিস্তান পিরিয়ডের এসকল এল. এম. এফ; এম. এম. এফ সার্টিফিকেট কোর্সধারী ডিপ্লোমা সমমান চিকিৎসকদের ২ বছর মেয়াদে কনডেন্সে এমবিবিএস কোর্স ও ১ বছর অতিরিক্ত ইন্টার্নশীপ করিয়ে প্রশাসন, জেলা ও মহুকুমা হাসপাতালে নিয়োগ প্রদান করেন। পরবর্তীতে এই চিকিৎসকরা অনেকেই অধ্যাপকও হয়েছেন। একই ভাবে তৎকালীন ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ এল. এম. এফ; এম. এম. এফ সার্টিফিকেট কোর্সধারী ডিপ্লোমা সমমান চিকিৎসকগণ কনডেন্সে এমবিবিএস কোর্স করার সুযোগ পান।’

আরও পড়ুন :  এনাটমি বিভাগে আমার শরীর দান করেছি, মৃত্যুরপর আমার কবর থাকবেনাঃ ডা. জাফরুল্লাহ

 

 

ডা. বাচ্চু আরো বলেন, ‘ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের একবার উচ্চশিক্ষা স্নাতক এমবিবিএস করার সুযোগ দিন। তারা এমবিবিএস অর্জনের পর সংশ্লিষ্ট উপজেলা, ইউনিয়নের স্বাস্থ্য স্থাপনার কোয়ার্টারে আবাসিক ভাবে থেকে গ্রামের মানুষের উন্নত চিকিৎসার দায়িত্ব নিবেন এবং লাইফবন্ড বা জীবনচুক্তিতে সই করবেন তারা কখনো সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা ইউনিয়ন কর্মস্থল গ্রাম ছেড়ে জেলা, বিভাগের সেকেন্ডারি, টারশিয়ারি, স্পেশ্যালাইজড্ স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে বদলি বা স্থানান্তরিত হবেন না। এটা করা সম্ভব হলেই জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে যাবে। এবিষয়ে সরকারের জরুরি সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।’

 

 

উল্লেখ্য ১৯৭১ সালের পরে এই যুদ্ধ পীড়িত ও যুদ্ধাহত নব স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, অনেক গরীব, দুস্থ, অসহায় মানুষের সামান্য রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদানও সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেটা মনে করতে হলে, আমাদের সেই পূর্বের কথা স্মরণ করতে হবে যখন সামান্য কলেরা রোগে গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য হয়ে যেত, অসংখ্য মানুষ মারা যেত। যা জনবান্ধব বঙ্গবন্ধু’র সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। ঠিক তখনি স্বল্প সময়ে সবার জন্য মৌলিক অধিকার চিকিৎসা সেবা প্রদান বাধ্যতামূলক করার জন্য বঙ্গবন্ধু’র সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ১৯৭৩-১৯৭৮ ইং মোতাবেক পূ্র্বেকার এলএমএফ, এমএমএফ কোর্সের কারিকুলাম অনুসারে চিকিৎসা বিদ্যায় ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি ‘ডিএমএফ’ কোর্স আন্তর্জাতিক ভাবে অনুমোদন করিয়ে নিয়ে আসেন। ১৯৭৬ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অনুমোদিত, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ কর্তৃক অধিভূক্ত, বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল স্বীকৃত মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল ( ম্যাটস্ ) এর মাধ্যমে ‘ডিএমএফ’ ডিপ্লোমা চিকিৎসকতা পেশা কোর্স টি প্রথম যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এদেশে ৮ টি সরকারি ম্যাটস্ ও প্রায় ২০৯ টি বেসরকারি ম্যাটস্ ডিপ্লোমা চিকিৎসকের ‘ডিএমএফ’ কোর্স টি পরিচালনা করে আসছে। এখানে ডিপ্লোমা মেডিকেল শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৯০,০০০ নব্বই হাজার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী প্রায় ১২ বার হাজার ডিপ্লোমা চিকিৎসক ‘উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার’ পদে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, উপ-হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল সহ বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন।
২০ বিশ হাজার ডিএমএফ ডিপ্লোমা চিকিৎসক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :