আজ বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৪৩ অপরাহ্ন

সিজোফ্রেনিয়া রোগকে হারিয়ে দেওয়া এক নোবেল বিজয়ী

সিজোফ্রেনিয়া মানে পাগল নয়। আমেরিকান বিজ্ঞানী, ম্যাথমেটিশিয়েন, গেইম থিওরির জনক জন ন্যাশ সিজোফ্রেনিয়ার রোগী ছিলেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিন হাসপাতালে  ও বাসায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে সুস্থ হয়ে উঠেন। স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় আবার গবেষণায় মন দেন, নোবেলজয়ী হন। তিনি যখন যুবক বয়সে স্কলারশিপ নিয়ে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি তে যান তখন তাঁর শিক্ষাগুরু রেফারেল হিসেবে একটি কথাই লিখেছিলেন, “সে গনিতের জন্যে এক জিনিয়াস”।

জনিয়াসরা একটু ব্যাক্তিক্রমী হন। যেকোন বিষয় নিয়ে তাদের চিন্তা ভাবনা সাধারনের মতো গতানুগতিক হয় না। তাই তারা হয়ে উঠেন আবিষ্কারক। সুদর্শন জন ন্যাশ প্রেমেও পড়েন কয়েক বার। বিখ্যাত “এ বিউটিফুল মাইন্ড” ছবিটি তাঁকে নিয়েই রচিত।

সিজোফ্রেনিয়া কী:

আমরা অনেকে সিজোফ্রেনিয়া রোগটি সম্পর্কে জানিই না। অথচ এ রোগে আক্রান্ত রোগী আমাদের চারপাশেই রয়েছেন। তাদের কেউ আমাদের পরিবারের, কেউ সহকর্মী আবার কেউ বা বন্ধুবান্ধবী। ক্যান্সার ডায়বেটিস শ্বাসকষ্ট হাইপ্রেসার এসবের মতো সিজোফ্রেনিয়াও একটি রোগ। কিন্তু অতি সাধারণ রোগটি সম্পর্কে আমরা মোটেও জানিনা আর না জানা থেকেই এ রোগ নিয়ে আমাদের অসেচেতনতা আর যত্তসব কুসংস্কার। এমনকি উদ্ভট এক নাম ধরে আমরা এ রোগ বা রোগীকে ডাকি, পাগল বা পগলামী।

হ্যা, সবাই এবার ধরতে পেরেছেন রোগটি মুল নাম সিজোফ্রেনিয়া বা স্কিজোফ্রেনিয়া। সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্তদের আমরা ‘পাগল’ বলে ডাকি স্রেফ আমাদের অজ্ঞানতা বা এ সম্পর্কে যথাযথ শিক্ষা না থাকার জন্যে।

সিজোফ্রেনিয়া রোগ কেনো হয়:

ব্রেইনের নিউরোট্রান্সমিটার ডোপামিন নিঃসরনের উলট পালটের জন্যেই মুলত সিজোফ্রেনিয়া রোগের সৃষ্টি। ব্রেইনের কোথাও ডোপামিন বেশি কোথাও কম তৈরী হয়। ফলে স্বাভাবিক আচার আচরনে এর লক্ষণ ফুটে উঠে। কারন ডোপামিন নিউরোট্রান্সমিটার এর জন্যেই আমরা সুন্দর ভাবে কথা বলি, মিশি, ভালোবাসা বা ভাব বিনিময় করি। আর ব্রেইনে এর অভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এসব আদান প্রদানে দেখা যায় উলট-পালট।

সিজোফ্রেনিয়া রোগীরা আপন মনে চলে, কথা বলে। বাহ্যিক পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। হয়তো দেখা যাবে তারা একা একা রাস্তায় দাড়িয়ে ক্রমাগত কথা বলছে, দৌড় ঝাপ করছে, বা চুপচাপ আনমনে কোথাও বসে আছে বা শুয়ে আছে। নাওয়া খাওয়া কোন কিছুর ঠিক নাই।

আরও পড়ুন :  ভুলে যাওয়া কি কোনো রোগ?

সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষন:

১. একা একা কথা বলবে, চিল্লা পাল্লা করবে, হাসবে কাঁদবে।

২. চিন্তা চেতনায় উলট পালট থাকবে। হয়তো আপনাকে শত্রু ভাববে, ভাববে আপনি  তাকে হত্যা করতে চান, তাত ক্ষতি করতে চান।

৩. তার দৈনন্দিন কাজকর্মের প্রতি কোন খেয়াল থাকবেনা।

৪. আত্মীয়স্বজন কাউকে চিনবে না, কারো সাথে কথা বলবে না, অথবা এও হতে পারে সবার সাথে অযথা ঝগড়া করতে থাকবে। এগুলোই হলো মুল লক্ষণ।

চিকিৎসা:

অবশ্যই। ডায়বেটিস, প্রেশার, হাপানী এসবের মতো সিজোফ্রেনিয়া রোগের ও দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসা আছে।  এদের মতো সিজোফ্রেনিয়া কেও নিয়ন্ত্রনে রেখে সুস্থ  জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয় অনেক দিন। অনেক সময় যক্ষা রোগীর মতো বেশক’দিন ওষুধ রোগীকে খাইয়ে দিতে হয়। কারন অনেক সময় রোগী ওষুধ খেতে চায়না।

কাদের বেশি হয়:

রোগটা অনেকটা বংশগত। ডায়বেটিস প্রেশার ও কিন্তু অনেক সময় বংশগত ভাবে হয়ে থাকে। সিজোফ্রেনিয়া পুরুষদের বেশি দেখা যায়।

সবসময় কি মানসিক হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়? না। রোগী যদি ওষুধ খায়না, উত্তেজনা পূর্ন আচরন করে তবেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

পরিনতি:

ডায়বেটিস, প্রেশার, হাপানী এসবের মতো এ’রোগ পুরো সারেনা। নিয়ন্ত্রনে রাখতে হয়। তবে ডায়বেটিস বা প্রেশারের মতো এরোগের ওষুধ কিন্তু আজীবন খেয়ে যেতে হয়না। যদি দেখা যায় একটা নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত ওষুধ খেয়ে রোগী সম্পুর্ণ সুস্থ তবে ওষুধ বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এর তত্তাবধানে থাকতে হবে।

ওষুধ:

মেডিসিন হিসেবে ডোপামিন ব্লকার  রেসপেরিডন, ওলাজাপিন, হ্যালোপেরিডল, সিজোপিন, ফ্লুপেনাজিন এসব ওষুধই বেশ ব্যবহৃত হয়। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে রোগীর একটু ঘুম হয়।

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :