আজ শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১০ পূর্বাহ্ন

কর্মবিরতি প্রত্যাহারের প্রথম দিনেই আরও দুই মর্মান্তিক ঘটনা

গত ০৪ এপ্রিল চিকিৎসকদের উপর হামলা ও হাসপাতাল ভাঙচুরের এতো বড় ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে যায়। এ কর্মবিরতির মাঝেও জরুরী বিভাগে সার্বক্ষণিক সেবা চালু ছিল। ইন্টার্নদের স্ব-প্রণোদিত হয়ে তৈরি করা বিশেষ টিম দিন রাত ২৪ ঘন্টা জরুরী বিভাগে সেবা দেয়, যাতে নিরপরাধ জনগণের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কম হয়। জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হয়, যা চলমান। হাসপাতালে একজন সাব ইন্সপেক্টরের অধীনে একটি পুলিশ বক্স স্থায়ীভাবে স্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধির কাছ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয় কর্মবিরতি প্রত্যাহারের। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সম্মানে মনের বিরুদ্ধে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। গতকাল ০৮ এপ্রিল থেকে তারা কাজে ফিরে। অত্যন্ত দু:খজনক বিষয়, কাজে ফেরার প্রথম দিনেই ঘটে দুইটি মর্মান্তিক ঘটনা।

বেলা ১২: ৪৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালের প্রসূতি ও গাইনী বিভাগে রোগীর আত্মীয়ও নয় এমন এক লোক তার দুই সঙ্গীসহ অন্যায়ভাবে চিকিৎসকের রুমে ঢুকে তাকে জেরা করা শুরু করে। চিকিৎসক তার পরিচয় জানতে চাইলে সে নিজেকে রোগীর ভাই পরিচয় দেয়, অথচ সে রোগী ও তার স্বজনদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা পরিস্কার জানিয়ে দেন যে ঐ লোক তাদের কেও না। লোকটিকে তখন হসপিটাল থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয়। সে বের না হয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকের দিকে তেড়ে আসে এবং তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়। খবর পেয়ে অন্যান্য ওয়ার্ড থেকে ঐ ডাক্তার সাহেবের সহকর্মী ইন্টার্ন চিকিৎসকরা দ্রুত ছুটে এসে দুষ্কৃতিকারীকে পাকড়াও করে পুলিশে সোপর্দ করে।

কর্মবিরতি প্রত্যাহার করার আগে প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছিলেন যে পরবর্তীতে এ ধরণের যে কোন ঘটনা ঘটলে দ্রুত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এর বিচার করা হবে। প্রশাসন তাদের আশ্বাস রাখেন। আসামীর উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করেন উপস্থিত সম্মানিত ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়।

কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি। রাত ৮:৩০ – ৯ টার কাছাকাছি সময়ে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আবারো ঘটতে যাচ্ছিল ০৪ এপ্রিলের মতো বা তার চেয়েও মর্মান্তিক কিছু একটা। তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে এক বাচ্চা ভর্তি হয় মুমূর্ষু অবস্থায়। তার জীবন সংকটাপন্ন ছিল। উপস্থিত ইন্টার্ন চিকিৎসক দ্রুত ছুটে গিয়ে বাচ্চাকে অক্সিজেন চালু করেন। চিকিৎসার অন্যান্য অর্ডার লিখতে লিখতে তিনি মরণাপন্ন বাচ্চাটির অভিভাবকদের কাছে পুরো অবস্থাটি ব্যাখা করতে থাকেন। বাচ্চাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

একজন নবীন চিকিৎসকের এতো ক্ষমতা নেই যে বিধাতার লেখনীকে পরিবর্তন করতে পারে। নিষ্পাপ একটা প্রাণকে নিজের হাতের উপর ঝড়ে যেতে দেখে চিকিৎসক অত্যন্ত মর্মাহত ছিলেন, সমব্যথী ছিলেন শিশুটির বাবা মায়ের প্রতি। কিন্তু দু:খজনক, রোগীর লোকজন অভিযোগ করে বসে, অক্সিজেন দিয়ে তাদের বাচ্চাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সে চিকিৎসক এ অভিযোগে হতবাক হয়ে যান। এ কেমন নিষ্ঠুরতা! শিশুটির মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসা ফেরেশতার সাথে এতোক্ষণ পাঞ্জা লড়া ডাক্তার নামের লোকটার প্রতি এ কেমন অভিযোগ!

আরও পড়ুন :  মেডিকেল সায়েন্স সত্যিই বিস্ময়ের বিস্ময়

যাহোক, কর্তব্যরত সিনিয়র চিকিৎসক দ্রুত উপিস্থিত হয়ে রোগীর স্বজনদের বিনীতভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে তীব্র শ্বাসকষ্টে থাকা রোগী, যার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে গেছে, তার চিকিৎসায় অক্সিজেন দেয়াটা খুবই বেসিক একটা চিকিৎসা। কিন্তু তারা কোন কথা শুনতে নারাজ। ঔদ্ধত্যপনা এতো বেশি বেড়ে গিয়েছিল যে, সাদা পোশাকে থাকা পুলিশের লোককেও ইন্টার্ন চিকিৎসক ভেবে কলার চেপে ধরে এবং হুমকি দেয় যে সমাজে তার অবস্থান এই সেই….। সে চাইলেই এক্ষুনি ১০০০ লোক জড়ো করে ডাক্তারসহ হাসপাতালের সবার পিঠের চামড়া তুলে নিতে পারবে।

প্রিয় দেশবাসী। অনেক কষ্ট করে ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছিলাম। দিনরাত এক করে পড়াশুনা করে ডাক্তারি পাশ করেছি। এখন ট্রেনিং এও আমরা ইন্টার্নিরা ২৪ ঘন্টা সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছি। না ঘুমের ঠিক আছে, না খাওয়া দাওয়া।

এরপরও যদি এভাবে না জেনে না বুঝে আপনার ভাইবোনের মতো এই নবীন চিকিৎসকদের দিকে বারবার তেড়ে আসেন, তাদেরকে বিবস্ত্র করতে থাকেন,,, বিচারটা কাকে দিব? ভাই আমি তো নতুন পাশ করা ডাক্তার। আমি তো পয়সার ধান্দাবাজিও করিনা। প্রাইভেটভাবে কোন রোগী দেখিনা। আমার মাসিক ভাতা কতো সেটা বলতে আমার লজ্জা হয়,, তাও প্রতিমাসে সে ভাতা কপালে জোটেনা। গত দুই মাস ধরে বেতন নাই। এতোদিন সান্ত্বনা একটাই ছিল, টাকা পরে কখনো হবে, এখন যত রোগী দেখব ততো অভিজ্ঞতা বাড়বে। সেটাও যদি না করতে পারি!

একজন ক্লাস ওয়ানের কোমলমতি শিশুকে পরীক্ষার হলে কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে আপনি যদি বলেন যে, তুই শালাকে আজ ১০০ তে ১০০ পেতেই হবে তাহলে কেমনে হবে?!!

ঘটনার পর আমাদের ডাক্তার সমাজের অভিভাবকদের কাছে ছুটে গিয়েছি, প্রাণ আর মানের ভিক্ষা চেয়েছি। জানিনা ভিক্ষা পাই কিনা।

পুনশ্চ: এখন নাইট ডিউটিতে কর্তব্যরত আছি। কারো মারতে ইচ্ছা হলে আসেন ভাই। আর কিছু বলার নাই।

ডা. মো. তাহমিদ আশরাফ

ইন্টার্ন চিকিৎসক,
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :