আজ শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

দেশে প্রতিবছর ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন!

বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেন। যাদের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাই বেশি। তবে, আত্মহত্যার চেষ্টা করেন এর চেয়েও আরো ১০ গুণ বেশি মানুষ। তাদের মধ্যে বয়সের হিসেবে তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই বেশি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিচার্সের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ, পেশা এবং ভৌগলিক অবস্থানের নিরিখে ৮ লাখ ১৯ হাজার ৪২৯ জনের ওপর সরাসরি জরিপ চালিয়ে তারা এই তথ্য প্রকাশ করে।

নানা সময়ে বাংলাদেশে যেসব আত্মহত্যার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে, তার মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৪৭তম এমবিবিএস ব্যাচের ডা. মোস্তফা মোর্শেদ আকাশের আত্মহত্যা অন্যতম। মৃত্যুর দুই ঘণ্টা আগে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়ার পিছনে তার স্ত্রীর পরকীয়াকে দায়ী করেন।

সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পাওয়া আরেকটি ঘটনা হলো, একজন মডেল আত্মহত্যার আগে ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্টের মাধ্যে সুইসাইড নোট দিয়েছিলেন৷ এমনকি আত্মহত্যা করার পুরো প্রক্রিয়াটি ভিডিওতে দেখান তিনি৷

আজকের পহেলা বৈশাখে বৈশাখী জামা কিনে না দেওয়ায় গত শুক্রবার টাঙ্গাইলের মধুপুরে হাসি আক্তার নামের এক স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। নিহত হাসি উপজেলার চক গাংগাইর গ্রামের কৃষক হায়দার আলীর মেয়ে। সে চক গাইংগাইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

এছাড়াও নানা সময়ে ভারতের একটি হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকা পাখির জামার মতো জামা না পেয়ে অভিমানে বাংলাদেশে কিশোরী-তরুণীদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, গত প্রায় তিন বছর ধরে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও সিরাজগঞ্জে পাখির মতো জামা না পেয়ে এক কিশোরী আত্মহত্যা করে।

এর বাইরে নির্যাতন, ইভটিজিং বা যৌতুকের কারণেও মহিলাদের আত্মহত্যার খবর প্রায় প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়। এছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষা, বিশেষ করে এসএসি ও এইচএসসির ফলাফল প্রকাশের সময় বা তার পর পরও আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষণীয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, শহরের চেয়ে গ্রামে আত্মহত্যার হার ১৭ গুণ বেশি৷ গ্রামে যাঁরা আত্মহত্যা করেন, তাঁদের বড় অংশ অশিক্ষিত এবং দরিদ্র৷

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘প্রিভেনটিং সুইসাইড: অ্যা সোর্স ফর মিডিয়া প্রফেশনালস ২০১৭’-এ বলা হয়,  প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে একটি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে এই সংখ্যা প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজনে পৌঁছুবে। একই প্রকাশনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা আরও বলছে, গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ৬০ শতাংশ  বেড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা।

আরও পড়ুন :  অসম্ভবকে সম্ভবে অনবদ্য এক নাম সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক চাপ, হতাশা, অবসাদ ও  হেনস্থার শিকার হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। আবার আর্থ-সামাজিক সমস্যা ও পারিবারিক সংকটের কারণেও অনেকে আত্মহত্যা করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে আত্মহত্যা করেন ১০ হাজার ৭৪৯ জন। আর ২০১৭ সালে নভেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ২৫৬ জন। বছর শেষে এই সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে। ডিএমপির গত দুই বছরের এই হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জনের বেশি আত্মহত্যা করছেন। এসব আত্মহত্যার বেশিরভাগই ফাঁসিতে ঝুলে। এছাড়া বিষপান ও আগুনে পুড়ে আত্মহননের ঘটনা ঘটছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ আত্মহত্যার ৯৭০টি ঘটনা পর্যালোচনা করে নারীদের বেশি আত্মহত্যার কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে নারীদের ওপর শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতন এবং ইভটিজিং-এর ঘটনা বাড়ায় অনেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন।

অবিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য হওয়া অথবা স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পর গর্ভধারণের কারণে অনেকে আত্মহত্যা করেন। বেশির ভাগ নারী আত্মহত্যা করেছেন গলায় দড়ি দিয়ে আর পুরুষেরা কীটনাশক খেয়ে।

এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, আত্মহত্যার দু’টি ধরন আছে – পরিকল্পিতভাবে এবং আবেগ তাড়িত হয়ে আত্মহত্যা। বাংলাদেশে অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা আবেগ তাড়িত হয়ে ঘটে। এ কারণে তরুণ-তরুণীরাই বেশি আত্মহত্যা করেন। তাছাড়া নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ার কারণ আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা। নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা ইত্যাদি।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :