আজ শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

চিকিৎসকদের সবার আগে ভালো মানুষ হতে হয় : ডা. লোটে শেরিং

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশে সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন,‘আগে আপনি একজন ভালো মানুষ হন, আপনি এমনিতেই একজন ভালো ডাক্তার হয়ে যাবেন।’

রোববার নিজের স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাস ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অডিটরিয়ামে আয়োজিত বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে ডা. লোটে শেরিং বলেন, আমি রাজনীতিতে এসেছি আমার পেশাকে ছেড়ে নয়। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমি চাকরি না করে, বিদেশে না গিয়ে আমি ভুটানের মানুষকে নিয়ে ভেবেছি। তাদেরকে নিয়ে কাজ করেছি। আজ আমি সে দেশের প্রধানমন্ত্রী।

তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের স্মৃতিচারণ করে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে আরও বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত আমি ও আমার সহপাঠী বর্তমান ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. টান্ডি দরজিসহ ময়মনসিংহ শহরের বাঘমারা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে ২০ নম্বর কক্ষে থেকেছি। এখনো একসাথে আমরা রাজনীতি করছি। এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের মাঝে কোনদিন মনোমালিন্য হয়নি। আজকে তাঁর কারণেই আমি প্রধানমন্ত্রী। আসলে তিনিই আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ছাত্রাবস্থায় বিভিন্ন সময়ের ঘটনা নিয়ে অনেকের নাম উল্লেখ করে ডা. লোটে শেরিং আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন।

ডা. লোটে শেরিংয়ের হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য

১৯৯৬ সাল। দিন তারিখটা ঠিক সঠিক মনে নেই আমার। আমি তখন ফোর্থ ইয়ারে পড়াশোনা করছি। আমি প্রচণ্ড ব্যাথায় কাতর, দুই একবার বমিও করেছি। পরদিন ভোর সকালেই বড় ভাই তানজিং দর্জি (ম-২৪) (একসাথেই থাকতাম ২০ নাম্বার রুমে। বর্তমান তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী) আমাকে নিয়ে যান আউটডোরে।

সেখানকার চিকিৎসক আমার পুরো বক্তব্য না শোনেই আমাকে ওমিপ্রাজলসহ আর কিছু ঔষধ লিখে দেন। আমি চলে আসলাম হলে। ঔষধ খেয়ে কোনো উন্নতি হলো না। বিকালে আবার গেলাম ওই স্যারের কাছে। তিনি আমার অবস্থা দেখে স্টুডেন্ট কেবিনে ভর্তি হতে বললেন। আমি ভর্তি হয়ে গেলাম।

পরের দিন বেশ কয়েকজন স্যাররা মিলে মেডিকেল বোর্ড বসল।কিন্তু সেটাও ফলপ্রসূ হলো না। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ একজন স্যার আসলেন আমার কাছে। উনি এসে আমাকে দেখেই বললেল-‘আরে ওর তো এপেন্ডিসাইটিস।’

এটা খুবই সহজ অপারেশন, আমি নিজেও হাজারখানেক এপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করেছি। বাবা তোমার ভয় নেই। স্যারের এই কথাগুলো এখনও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে।

সেদিন রাতেই আমার অপারেশন হলো,কিছুদিন পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি। সেদিনের ওই মানুষটি ছিলেন খাদেম স্যার।পরবর্তীতে যিনি হয়ে উঠলেন আমার আদর্শ। আমাদের সম্পর্ক ক্রমে উন্নত হতে থাকল।

আরও পড়ুন :  লাইফ সাপোর্টে পাইলট আবিদের স্ত্রী

আমি এমবিবিএস শেষ করার পর এফসিপিএস করি বাংলাদেশেই।পার্ট টু পরীক্ষার ফলাফল যখন হবে বিকালের দিকে আমরা সবাই বসে আছি নিচ তলায় রেজাল্টের অপেক্ষায়। হঠাৎ স্যার আসলেন,আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন,” You have done it”.

সেদিনকার পর ২০০২ সালে জুন মাসের দিকে আমি ফিরে যায় আমার নিজ দেশ ভুটানে।সেখানে একটা হাসপাতালে কাজ শুরু করি জেনারেল সার্জন হিসাবে।প্রথমদিনই আমি ছুটে গিয়েছিলাম মন্দিরে দোয়া নিতে।

এর পরদিন,এপেন্ডিসাইটিসের একজন রোগী আসল। আমি আমার জুনিয়র কলিগকে বললাম তুমি এটা করে ফেল,খুবই সহজ কাজ।না পারলে তো আমি আছিই। প্রায় ১০ মিনিট পর ও আমাকে ডাকল।আমাকে যেতেই হবে।

আমি যাওয়ার সময় অপারেশন থিয়েটারের সামনে বসা একজন সুন্দরী মহিলা এসে আমার সাথে পরিচিত হয়ে বলতেছেন,আমি এই হাসপাতালেরই একজন নতুন ডাক্তার। কদিন ক’দিন আগেই কাজ শুরু করেছি। ওইদিনের (মঞ্চের দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে) সেই মহিলাটিই হলেন আমার স্ত্রী। যিনি এখন আমার সামনে উপস্থিত। আর ওই এপেন্ডিসাইটিসের রোগী ছিলেন উনারই চাচা। সেদিন আমি বুঝলাম এপেন্ডিসাইটিসের গুরুত্ব।

তারপর হেসে হেসেই বললেন, ‘কে বলছে আমাদের দেহে এপেনডিস্কের কোনো Function নেই। Appendix has a great role in our society.’

ডাক্তার সমাজের জন্য তাঁর উপদেশ- Don’t Be Ambious,Do Your Best.Be A Good Human Being. ‘আগে আপনি একজন ভালো মানুষ হন, আপনি এমনিতেই একজন ভালো ডাক্তার হয়ে যাবেন।”

স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাসে

রোববার (১৪ এপ্রিল) সকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে ময়মনসিংহে পৌঁছলে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীরা তাঁকে স্বাগত জানায়। তাঁর সহপাঠিরা ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করেন তাকে। পরে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন।

২৮তম ব্যাচের ছাত্র ডা. লোটে শেরিং ১৯৯১ সালে বিদেশী কোটায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। এমবিবিএস পাস করে ঢাকায় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. টান্ডি দরজি, স্বাস্থ্য মন্ত্রী লায়োনপু দিহেন ওয়াংমু, প্রধানমন্ত্রী সহর্ধমিনী ডা. উগেন ডেমা, ত্রান ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, স্বাস্থ্য সচিব জি এম সালেহ উদ্দিন, জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, চার দিনের সরকারি সফরে শুক্রবার সকালে বাংলাদেশে এসেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং। সোমবার থিম্পুর উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন।

সৌজন্যে : মেডিভয়েস।

আপনার মন্তব্য লিখুন :

আরও পড়ুন :

সংবাদটি শেয়ার করুন :