আজ বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১০:২১ অপরাহ্ন

আজ জাতীয় কবির জন্মদিন

জুয়েল রানাঃ
কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট,’

‘বল বীর, বল উন্নত মম শির,’

‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত…’

এমন জাগরণী উক্তি দিয়ে দেশবাসীকে জাগিয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন জাতিকে। আজ ২৫ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ); সেই বিদ্রোহী কবির ১২০তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৯৯ সালের (১৩০৬ বঙ্গাব্দের) এ দিনে কলকাতার বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। আসলে ‘দুখু মিয়া’ ছিলেন বাংলার দামাল ছেলের প্রতীক। কবির বাবার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মায়ের নাম ছিল জাহেদা খাতুন। তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি মূলত প্রেম-দ্রোহ, সাম্য-মানবতা ও শোষিত মানুষের মুক্তির কবি।

বাংলায় সর্বোচ্চসংখ্যক তিন সহস্রাধিক গানের স্রষ্টা কাজী নজরুল ইসলাম। নিজস্ব ধারার সঙ্গীত রচনা করেছেন তিনি। প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত কবি মানুষের সংকীর্ণতা, দীনতা, মূঢ়তা ও নীচতাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেছেন। শোষিত মানুষের মুক্তির প্রথম বার্তাবাহক কবি নজরুলের লেখা কবিতা-গান আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুুগিয়েছে। তার লেখা ‘চল চল চল’ আমাদের রণসঙ্গীত। গান ও কবিতার মতো তার লেখা গল্প, নাটক, উপন্যাসও এ জাতির অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’ কবির এ গানের কথা স্মরণে রেখে মৃত্যুর {মৃত্যু:- ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ)} পর তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। আজ তার সেই অন্তিম শয্যা ছেয়ে যাবে অগণিত অনুরাগীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ফুলে ফুলে।
প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ণাঢ্য আয়োজনে সারা দেশে উদযাপন হবে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশজুড়ে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে।

জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি- মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী- শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে পৃথক বাণী দিয়েছেন। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হবে কবিকে নিয়ে নিবন্ধ। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত হবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসা কবির জন্মবার্ষিকীর দিনটি জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালবাসায় পালন করবে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তিনি শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের যখন আবির্ভাব তখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এ দেশের সাহিত্যে এক বিশাল মহীরুহের মতো অবস্থান করছিলেন। সে সময় খুব কম কবিই রবীন্দ্র প্রভাব এড়িয়ে কাব্যচর্চায় সাফল্য পেয়েছিলেন। কাজী নজরুল ছিলেন সেই মুষ্টিমেয় কবির একজন, যিনি রবীন্দ্র প্রভাবের বাইরে বাংলা কবিতায় এক নতুন যুগের সূচনা করেন। তখন ভারতসহ পৃথিবীর নানা দেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমন অবস্থায় নজরুল প্রকৃতপক্ষে গোটা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। এদিক দিয়ে নজরুল একক এবং অনন্য। বিশ্বসাহিত্যে তার মতো কবি খুব কম। তবু কেউ কেউ কাজী নজরুলের সঙ্গে রুশ কবি মায়াকোভস্কি ও তুরস্কের কবি নাজিম হিকমতের কাব্যের মিল খুঁজে পান। সব মিলিয়ে নজরুল এক বহুমুখী প্রতিভা। নজরুল একদিকে ছিলেন বিদ্রোহী, অন্যদিকে মানবতাবাদী। তার গান জাতিকে জাগরণের পথে প্রেরণা যুগিয়েছে। ইসলামী গানের পাশাপাশি তিনি শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। কোথাও উদার মানবতাবাদকে বিসর্জন দেননি। নজরুল সারা জীবনই মানবতার সাধনা করেছেন। তার কবিতা, গান ও গদ্য উপমহাদেশের মানুষকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছে। একজন সাংবাদিক হিসেবেও নজরুল অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। তার সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা রচনার জন্য কবি রাজদ্রোহের অপরাধে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিস্ময়কর প্রতিভা নজরুল কখনই ধন-সম্পদের প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। বলা চলে দারিদ্র্য ছিল তার চিরকালের সঙ্গী। তিনি জগতের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের দুঃখ-কষ্ট গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে হঠাৎ করেই তার সাহিত্য সাধনা স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি দীর্ঘকাল বেঁচেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা-গান ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে সসম্মানে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির সম্মান দেন।

বাংলাদেশে তার অনেক স্মৃতিবিজড়িত স্থান রয়েছে। তার সাহিত্যকর্মের উপজীব্য বিষয়গুলোও অনেকখানি এই বাংলাকেন্দ্রিক। বাংলাদেশে তার স্মৃতিবিজড়িত বেশ কয়েকটি স্থান রাষ্ট্রীয় তদারকিতে সংরক্ষিত হয়েছে। ঢাকায় নজরুল ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহের ত্রিশালে- জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনসহ বিভিন্ন স্থানে কবি নজরুলের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। তার পরও বলতে হয়, নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত দুই বাংলায় এখনও তার পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচিত হয়নি। দুই বাংলায় নজরুল বিষয়ক বহু গবেষক আছেন, তাকে নিয়ে অনেক গবেষণাও হয়েছে। গবেষকরা নজরুলের পূর্ণাঙ্গ জীবনীর ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারেন। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এটা আমাদের দায়িত্ব। মনে রাখা দরকার, নজরুল শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নন, তিনি সমগ্র মানবজাতির সম্পদ।

-এস.এম.এ জুয়েল রানা-
——-ল্যাব ইনচার্জ ——-
——–সি.ডি.সি.সি———-

আপনার মন্তব্য লিখুন :
সংবাদটি শেয়ার করুন :