আজ বৃহস্পতিবার, ২০ Jun ২০১৯, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
«» ” উৎসর্গ ফাউন্ডেশন, শ্যামলী ম্যাটস শাখার পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা “ «» “উৎসর্গ ফাউন্ডেশ, বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবী মিলনমেলা রেজিস্ট্রেশনের শেষ তারিখ ৩০শে জুন “ «» ব্যথানাশক ঔষুধ ছাড়াই বিকল্প ম্যাজিক পেইন কিলার! «» বাংলাদেশের বাজারে মেয়াদোত্তীর্ণ সব ওষুধ এক মাসের মধ্যে ধ্বংস করার আদেশ দিয়েছে আদালত «» নিজের চেম্বার নেই : রকে বসে প্রতিদিন শত রোগী দেখেন গরীবের ডাক্তার «» আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রোগী যাওয়া বন্ধ করতে : ডা. দেবী শেঠী «» চিকিৎসকদের সুরক্ষায় কড়া আইন করছে ভারত : হাসপাতালে বিশেষ নিরাপত্তাবলয় «» রেশম দিয়ে কৃত্রিম ধমনি : যুগান্তকারী আবিষ্কার বাঙালি চিকিৎসক-গবেষকদের «» নিজের টাকায় শিশুদের জীবন দান করা ডা. কফিল খান বকেয়া বেতনও পাচ্ছেন না «» ডাক্তারদের আত্মরক্ষা আন্দোলনের জেরে হাসপাতালগুলো এবার পুলিশি সুরক্ষা পেল

রোজা, অটোফেজি এবং শরীরের প্রাকৃতিক শুদ্ধতা

পৃথিবীর অনেক জ্ঞানী বিখ্যাত ব্যক্তিরাই শরীরে প্রাকৃতিক নিরাময়ের ক্ষেত্রে একটিমাত্র অভিন্ন সমাধান দিয়েছেন। কী সেই সমাধান? উত্তর শুনলে হয়তো অনেকেই চোখ কপালে তুলবেন। সমাধানটি হচ্ছে ইন্টারমিটেন্ট ফ্যাস্টিং বা সবিরাম উপবাস।

উপবাস নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস বলেছেন, আমাদের প্রত্যেকের শরীরের মধ্যেই একজন ডাক্তার বসবাস করেন, আমাদের উচিত সেই ডাক্তারকে কাজ করতে দেয়া। এটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তিনি আরো বলেছেন, খাবারই হওয়া উচিত আমাদের ওষুধ, ওষুধই হওয়া উচিত আমাদের খাবার। কিন্তু আমরা যখন অসুস্থ হই তখন যদি আমরা খাবার গ্রহণ করি, তা প্রকারান্তরে সেই অসুস্থতাকেই খাবার জোগান দেয়া। শরীরের ডাক্তারকে কাজ করতে দেয়ার জন্য প্রয়োজন উপবাস, উপবাস করলেই শরীরের সেই ডাক্তার কাজ করতে পারে। এ বিষয়ে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, সবচেয়ে ভালো ওষুধ হচ্ছে উপবাস এবং বিশ্রাম।

সবিরাম উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফ্যাস্টিং প্রসঙ্গে আলোকপাত করার আগে আরো একটা বিষয়ে জানা ভালো, সেটি হচ্ছে ফ্যাস্টিং এবং স্টারভেশন কিন্তু এক নয়। স্টারভেশন মানে অপরিকল্পিত অনাহার যাতে অপুষ্টির ঝুঁকি থাকে। সবিরাম উপবাস বা ইন্টারমিটেন্ট ফ্যাস্টিং একটি পরিকল্পিত উপবাস, এর একটা নির্দিষ্ট ডিজাইন থাকে, নিয়ম থাকে তা সে যেমনই হোক। রোজা তেমনই এক ধরনের উপবাস যা ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে মুসলমানরা করে থাকেন। অন্যান্য ধর্মেও নানা ধরনের উপবাসের প্রচলন আছে।

শরীর নিরোগ রাখার প্রাকৃতিক সমাধান হচ্ছে সবিরাম উপবাস। এবার দেখা যাক সবিরাম উপবাস কীভাবে শরীরের উপকার করে। মানুষের শরীর এমনভাবে তৈরি যে, প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য শরীর খাবার সঞ্চিত রাখতে পারে। কেউ যদি টানা ১০-১২ ঘণ্টা উপবাস থাকেন তখন লিভারে সঞ্চিত খাবার গ্লাইকোলাইসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরে খাবারের চাহিদা পূরণ করে শক্তির যোগান দেয়। এছাড়া উপবাসে শরীরের বাড়তি চর্বি ব্যবহৃত হয়, কমে যায় ক্ষতিকর কোলেস্টেরল মাত্রা, কমে হৃদরোগের ঝুঁকি, সহজেই নিয়ন্ত্রণে থাকে উচ্চ রক্তচাপ, সাথে কমে যায় ওজনও। তাছাড়া মানসিক প্রশান্তি তো আছেই। এগুলোর প্রায় সবই আমাদের জানা আছে।

এই ঘটনা ছাড়াও আরো একটি বিষয় ঘটে শরীরের মধ্যে। সেটি হচ্ছে প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরের বিভিন্ন কোষ মরে যায়, মৃত এই কোষগুলো কোষের অভ্যন্তরে লাইসোজোম নামের একটি বিশেষ কোষাঙ্গে জমা হতে থাকে। একইভাবে শরীরের মধ্যে মৃত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাসও জমা থাকে লাইসোজোমে। বলা যেতে পারে লাইসোজোম হচ্ছে কোষের রিসাইকেল গার্বেজ বিন। কিন্তু শরীর যখন কোনো চাপের মুখে পড়ে তখন রিসাইকেল গার্বেজ বিনে সঞ্চিত মৃতকোষগুলো থেকে শরীর শক্তি এবং নতুন কোষ তৈরি করে। যার ফলে শরীরের বর্জ্য ব্যবহৃত হয়ে শরীরকে করে দূষণমুক্ত। শরীরের এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অটোফেজি, যার অর্থ হলো সেল্ফ ইটিং বা আত্মভক্ষণ। অটোফেজি প্রক্রিয়ার এই বিষয়টি আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে ২০১৬ সালে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন জাপানের ডা. ইয়োসনারি উসোমি। তারপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। শরীর সুস্থ রাখার জন্য অটোফেজি খুবই দরকারি একটি বিষয়৷ অটোফেজি হচ্ছে শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে দূষণমুক্ত করার পদ্ধতি। কোনো কারণে এই অটোফেজি প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে শরীরে বিষাক্ত পদার্থের পরিমান বেড়ে গিয়ে তা টাইপ-টু ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও অটোফেজি প্রক্রিয়ায় শরীরে তৈরি হয় নাইট্রিক অক্সাইড। এই নাইট্রিক অক্সাইড দেহকোষকে পুনরুজ্জীবিত করে বাড়িয়ে দেয় কোষের আয়ু যা এন্টি এজিং বা বার্ধক্য রোধক হিসাবে কাজ করে। কোষ পুনরুজ্জীবনের ইতিবাচক প্রভাব পুরো শরীরের ওপরই পড়ে যা অন্য অঙ্গের উপকারে আসে।

তার মানে হচ্ছে অটোফেজি শরীরকে ভাঙ্গে না বরং শরীর গড়ে। আর অটোফেজির এই পদ্ধতি চালু হতে প্রয়োজন কিছুটা দীর্ঘ সবিরাম উপবাস। রোজাও এক ধরনের সবিরাম উপবাস। ১০-১২ ঘণ্টার উপবাসে শরীরে অটোফেজি প্রক্রিয়া চালু হয়, রোজা রাখলেও এই শারীরিক সুবিধা পাওয়া যায়। তবে এসব কিছুই সুস্থ ব্যক্তির সুস্থতার জন্য। কিছু কিছু অসুস্থতায় সবিরাম উপবাস এবং অনাহার দুটোই ক্ষতিকর হতে পারে। অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে সবিরাম উপবাস উপকারে আসে। তবে যাদের রোগ নিয়ন্ত্রণে নেই, বিশেষ করে কিডনি রোগ, হার্টের কার্যক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কম তাদের জন্য রোজা বা সবিরাম উপবাস প্রযোজ্য নাও হতে পারে। সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। কিন্তু কেউ কেউ আছেন অটোফেজির মতো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার উপকারী দিকগুলো যে রোজার মাধ্যমেও পাওয়া যায় তা ঠিক মানতে চান না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, গবেষণা রোজা নিয়ে হয় নি, হয়েছে ফাস্টিং নিয়ে। একইভাবে অন্য একটি দল আছেন যারা রোজার উপকারের কথা বলতে গিয়ে, ফাস্টিং নিয়ে যে কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার ফলকেই পবিত্র কোরানে আগেই সে বিষয়ে বলা আছে বলে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। কথা হচ্ছে- কোরানে সরাসরি অটোফেজির উল্লেখ না থাকলেও রোজা রাখার মাধ্যমে শরীর অটোফেজির সুবিধা পাবে না- তা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি কোনো গবেষণার সঙ্গে রোজার সম্পৃক্ততা পেলেই সেই গবেষণা অসার হয়ে যায় না।
____________________________

ডা. সজল আশফাক 

বাংলাদেশে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে সাহিত্যের মাধুর্যে অনন্য রূপদানকারী জনপ্রিয়তম লেখক। জনপ্রিয় উপস্থাপক।

আপনার মন্তব্য লিখুন :
সংবাদটি শেয়ার করুন :