আজ শনিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৯, ০৪:৩৪ পূর্বাহ্ন

আমাদের সন্তানদের ঘৃণা করব নাকি গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার ঘৃণা করবে ডিপ্লোমা ডাক্তারদের ? 

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই কিছু নিউজ পোর্টালে যখন চোখ পড়ে, আমি অত্যন্ত ব্যথিত হই। যদিও আমি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি না; তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় হয়তো পূর্বের জন্মে কোন পাপ করেছিলাম যার ধরুন আজ এই বাংলায় ডিপ্লোমা চিকিৎসকতা পেশায় এসে হেনস্থার শিকারের খাতায় আমার নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে।

 

বিষয়টি একটু খোলাসা করে বলি। সকল গ্র্যাজুয়েট এমবিবিএস/বিডিএস চিকিৎসকগণ আবার আমার কথার ভুল বোঝবেন না। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই গুটিকয়েকজন স্নাতক এমবিবিএস/বিডিএস ধারী ডাক্তার বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের পঞ্চম তফসিল নিবন্ধিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি ডিএমএফ ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী ডিপ্লোমা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর লেখালেখি করেন! তাদের ধারণা ডিপ্লোমা চিকিৎসক বলে কোন বিষয় নেই! তারা মনে করেন এ্যালোপ্যাথিক ডিপ্লোমা ডাক্তার বলে কোন টার্ম বাংলায়, উপমহাদেশে, বিশ্বে ছিল না, নেই! আশ্চর্যের বিষয়! তারা ভাবেন মেডিকেল ডিপ্লোমাধারীরা অচিকিৎসক কিংবা হাতুড়ে! এই গুটিকয়েক গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক সমগ্র ডিপ্লোমা চিকিৎসক কমিউনিটিকে সমগ্র গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। যার জন্য আজ এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় ডিপ্লোমা-গ্র্যাজুয়েট দ্বন্দ্ব তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। যা একজন চিকিৎসাকর্মী হিসেবে আমায় ভীষণ ভাবায়।

এই গুটিকয়েক গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকের কাছে আমার প্রশ্ন সারাবিশ্বের স্বীকৃত সকল চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন; হোমিওপ্যাথিক, ইউনানী, আয়ুর্বেদিক প্রভৃতি শাস্ত্রে ডিপ্লোমা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, ডিপ্লোমা ইউনানী চিকিৎসক, ডিপ্লোমা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক প্রভৃতি থাকলে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে এ্যালোপ্যাথিক ডিপ্লোমা চিকিৎসক থাকবে না কেন ?
মানলাম, এদেশের চিকিৎসা পেশায় জেলাস বেশী। এখানে বড় ডাক্তার ছোট ডাক্তারদের উপর জেলাস ফিল করেন। তাই বলে অপপ্রচার ? বড় ডাক্তার যদি ছোট ডাক্তারদের প্রতি আন্তরিক না হন, ছোট ডাক্তার কি করবে সম্মান বড় ডাক্তারদের ? আপনারা ডাক্তাররা নিজেরাই নিজেদের নিয়ে যা শুরু করছেন তা আল্লাহ্ই একমাত্র মালুম! এরপরও আবার রোগীর শ্রদ্ধা, ভক্তি কিংবা পাবলিকের সম্মান, ভালোবাসা প্রত্যাশা করা কতটুকু যুক্তি সংগত ?

 

ব্রিটিশ- পাকিস্তান পিরিয়ডের মেডিকেল কাউন্সিল নিবন্ধিত লাইসেন্সশিয়েট অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি এলএমএফ, মেম্বার অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি এমএমএফ সমমান ডিপ্লোমাধারী ডিপ্লোমা চিকিৎসকগণ কি তাহলে অচিকিৎসক বা হাতুড়ে ছিলেন ?
আধুনিক এ্যালোপ্যাথিকের জয়কার যুগ অষ্টাদশ শতক থেকে বিংশ শতকের মাঝামাঝি বা তারও বেশী সময় পর্যন্ত যখন এদেশে মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ কিংবা এমবিবিএস/বিডিএস কোর্স ছিল না, তখন তো এসকল এলএমএফ, এমএমএফ সমমান ডিপ্লোমাধারী ডিপ্লোমা চিকিৎসকগণই ঔপনিবেশিক-পাকিস্তান আমলে এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা সেবা দিতেন। কালের এই আবর্তনে এসে চিকিৎসা সেবায় তাদের সেই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা অস্বীকার করে তাদের অচিকিৎসক বা হাতুড়ে আখ্যা দেয়া কি উচিত ? প্রত্যেক এলএমএফ, এলএমএফ ডাক্তারের কবর বা চিতার উপর অচিকিৎসকের সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলের কি বলা উচিত তারা ডাক্তার ছিলেন না ? এলএমএফ, এলএমএফদের হাতুড়ে-কোয়াক টাইটেল না দিলে কি চলে না ? ডাক্তারের একটি বৈষম্যমূলক সংজ্ঞা না দিলেই কি নয় ?

 

কে চিকিৎসক আর কে চিকিৎসক নন, সেটা দেখার জন্য এদেশে আইন আছে, সর্বোচ্চ আদালত আছে তারপরও কেন এ বিষয়টি নিয়ে মিথ্যাচার হবে ?
সকল ক্যাটাগরির সকল শাস্ত্রের চিকিৎসকদের তো বোঝা উচিত ডাক্তারি পেশা একটি মানবিক পেশা। চিকিৎসকগণ রোগীর প্রতি এমন মানবিক হবেন যে, রোগী সুস্থ না হলেও মনে করবেন চিকিৎসক তার রোগ সারানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন, করছেন। কোনো এক বড় ডাক্তারের কি উচিত তার নিচের সাঁরির ডাক্তারদের প্রতি, রোগীর প্রতি, মনুষ্য সন্তানের প্রতি অমানবিক হওয়া ? বড় ডাক্তার কেন হবেন এমন অমানবিক ? বড় ডাক্তারের টাকা কামানোর ধান্দায় ছোট ডাক্তার বাঁধ সাধে ? ডাক্তারি পেশা কি স্রেফ টাকা কামানোর জন্য ? যার যার জায়গা থেকে জনগণের চিকিৎসা সেবা দিলে দোষ কি ? কোনো ডাক্তার প্রেসক্রিপশন প্যাড কিংবা ভিজিটিং কার্ডে ডাক্তার উপাধি প্রিফিক্স ডা. লেখে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত পদবি কিংবা স্বীকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণ লেখলে তো সবারই বোঝতে পারার কথা সে কোন মাপের ডাক্তার, কোন শাস্ত্রের ডাক্তার। এতে জেলাস ফিল করার কি আছে? ডিপ্লোমা ডাক্তার না মানলে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডাক্তারগণ সিম্পল গ্র্যাজুয়েটদের ডাক্তার মানবেন কেন ?

 

ডাক্তারের প্রকৃত সংজ্ঞা যেমন সকল ডাক্তারকে জানতে হবে, তেমন জীবনের সকল ক্ষেত্রেই একজন মানবিক ডাক্তার হিসেবে সর্বোত্তম মানবিক গুণাবলীর পরিচয় দিতে হবে। কোন সত্য ঘটনা আড়াল করে মানুষকে বিপদগ্রস্ত করা কোনো ডাক্তারের কাজ হতে পারে না।
সমগ্র স্বাস্থ্য সেক্টরের আজকের অবস্থানের জন্য কোনো একশ্রেণীর স্বাস্থ্যকর্মীই কেবল কাজ করে নি। এ অর্জন সকল স্বাস্থ্যকর্মীর।
প্রত্যেক শাস্ত্রের প্রত্যেক ক্যাটাগরির চিকিৎসকদের মনে রাখতে হবে যে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, নাতো আইন দ্বারা বলবৎকৃত কোনো সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। জোর করে কারো উপর আইন চাপিয়ে দেয়া যায় না। আইনের চোখে সবাই সমান।

 

এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রায় ৩০ ত্রিশ হাজার বিএমডিসি নিবন্ধিত ডিএমএফ ডিপ্লোমা চিকিৎসক রয়েছেন। নিবন্ধিত এসব ডিপ্লোমা চিকিৎসকের প্রায় ১ হাজার সন্তান-সন্ততি এদেশেরই গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক। ব্রিটিশ-পাকিস্তান পিরিয়ডের এদেশের ১৮ হাজার এলএমএফ, এমএমএফ ডিপ্লোমা সমমান চিকিৎসকদের ১৫ হাজার সন্তান-সন্ততি এদেশেরই গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক। ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ পিরিয়ডে অনেক এলএমএফ, এমএমএফ চিকিৎসক কনডেন্স কোর্সে এমবিবিএস অর্জন করেছেন, পরবর্তীতে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনও কমপ্লিট করেছেন। ডিএমএফ ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের মধ্যেও রয়েছেন হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট- গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত ডিপ্লোমা চিকিৎসক। আমরা কি আমাদের সন্তান-সন্ততি গ্র্যাজুয়েট ডাক্তারদের ঘৃণা করব, নাকি গ্র্যাজুয়েট ডাক্তারগণ ঘৃণা করবে ডিপ্লোমা ডাক্তারদের ?

ডিপ্লোমা চিকিৎসকগণ তো ডিএমএফ ডিপ্লোমা ডাক্তারির হালাল উপার্জনেই তাদের সন্তান-সন্ততিদের গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক বানিয়েছেন, বানাচ্ছেন। তবে কি গুটিকয়েক গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকের বলা উচিত ডিপ্লোমা চিকিৎসকগণ অচিকিৎসক, হাতুড়ে ? গুটিকয়েক গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকের কি উচিত ডিএমএফ ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের নিয়ে অপপ্রচার করা ? নাকি জগতের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট- গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত ডিপ্লোমা চিকিৎসকগণ তাদের (ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের) বিরুদ্ধে অপপ্রচার ঠেকানোর সক্ষমতা রাখেন না ? নাকি ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের সক্ষমতা জানান দেয়া অতিব জরুরী?

 

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের পরে এই যুদ্ধ পীড়িত ও যুদ্ধাহত নব স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, অনেক গরীব, দুস্থ, অসহায় মানুষের সামান্য রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদানও সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। সেটা মনে করতে হলে, আমাদের সেই পূর্বের কথা স্মরণ করতে হবে যখন সামান্য কলেরা রোগে গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য হয়ে যেত, অসংখ্য মানুষ মারা যেত। যা জনবান্ধব বঙ্গবন্ধু’র সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। ঠিক তখনি স্বল্প সময়ে সবার জন্য মৌলিক অধিকার চিকিৎসা সেবা প্রদান বাধ্যতামূলক করার জন্য বঙ্গবন্ধু’র সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ১৯৭৩-১৯৭৮ ইং মোতাবেক ব্রিটিশ- পাকিস্তান আমলের এলএমএফ, এমএমএফ ডিপ্লোমা সমমান চিকিৎসকদের কোর্স কারিকুলাম অনুসারে চিকিৎসা বিদ্যায় ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি ‘ডিএমএফ’ কোর্স আন্তর্জাতিক ভাবে অনুমোদন করিয়ে নিয়ে আসেন। ১৯৭৬ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অনুমোদিত, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ কর্তৃক অধিভূক্ত, বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল স্বীকৃত মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল ( ম্যাটস্ ) এর মাধ্যমে ‘ডিএমএফ’ ডিপ্লোমা চিকিৎসকতা পেশা কোর্স টি প্রথম যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এদেশে ৯ টি সরকারি ম্যাটস্ ও প্রায় ২০৯ টি বেসরকারি ম্যাটস্ ডিপ্লোমা চিকিৎসকের ৪ বছর মেয়াদী ‘ডিএমএফ’ কোর্স টি পরিচালনা করে আসছে। এখানে ডিপ্লোমা মেডিকেল শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৯০,০০০ নব্বই হাজার। বিজ্ঞান বিভাগে বায়োলজি সহ প্রথম শ্রেণিতে এস.এস.সি পাশ করে ডিএমএফ কোর্সে ভর্তি হতে হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী প্রায় ১২ বার হাজার ডিপ্লোমা চিকিৎসক ‘উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার’ পদে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, উপ-হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল সহ বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। প্রায় ১৮ আঠারো হাজার ডিএমএফ ডিপ্লোমা চিকিৎসক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন।

 

লেখক : ডা. এম. মিজানুর রহমান (জনস্বাস্থ্যবিদ)

ডিপ্লোমা চিকিৎসক পেশাজীবী নেতা।
পোস্ট গ্র্যাজুয়েট জনস্বাস্থ্যবিদ পেশাজীবী নেতা।
আইন শাস্ত্রের শিক্ষার্থী ও সুলেখক।

সংবাদটি শেয়ার করুন :