ঢাকা ০৭:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জেলা-উপজেলায় চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই: বরিশাল বিভাগের এক কোটি মানুষের ভরসা একা ‘শেবাচিম’

  • মেডি নিউজ ডেস্ক:
  • প্রকাশের সময় : ১২:০১:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত

বরিশাল বিভাগের প্রায় এক কোটি মানুষের চোখের চিকিৎসায় একমাত্র সরকারি ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম)। বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ না থাকায় চিকিৎসাসেবার জন্য রোগীদের ছুটে আসতে হচ্ছে বিভাগীয় শহরের এই একটিমাত্র হাসপাতালে। ফলে যাতায়াত খরচ ও সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘ অপেক্ষার চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে প্রতিবছর নতুন করে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ ছানি রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু শেবাচিম ছাড়া বিভাগের অন্য কোনো সরকারি হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ পদায়ন না থাকায় এই বিপুলসংখ্যক রোগীর পুরো চাপ সামলাতে হচ্ছে একা শেবাচিমকে।

শেবাচিম চক্ষু বিভাগে অনুমোদিত ৬টি পদে বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন চিকিৎসক। একজন রেজিস্ট্রার ও তিনজন আউটডোর মেডিকেল অফিসারের (আইএমও) পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে কেবল একজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও একজন আইএমও দিয়ে চলছে পুরো বিভাগের চক্ষু চিকিৎসা સેવા।

প্রতিদিন ভোর থেকেই বহির্বিভাগে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পটুয়াখালী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক যুবক বলেন, “উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চক্ষু ডাক্তার থাকলে এত দূরে এসে অতিরিক্ত টাকা খরচ ও লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করতে হতো না।”

একই আক্ষেপ ৭০ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর হাওলাদারের। চোখে ঝাপসা দেখে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন তার চোখে ছানি পড়েছে। তিনি বলেন, “বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের খরচ অনেক বেশি, তাই কম খরচে চিকিৎসার আশায় শেবাচিমে এসেছি। কিন্তু এখানে এসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।”

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট ও দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক নিম্ন আয়ের রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যাচ্ছেন। চিকিৎসা নিতে আসা সাব্বির আহমেদ জানান, সরকারি হাসপাতালে সুযোগ সীমিত হওয়ায় বাধ্য হয়ে বেসরকারিতে যেতে হচ্ছে, যেখানে দ্রুত সেবা মিললেও চিকিৎসার বায়ভার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. ডিবি পাল এ বিষয়ে বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতি থাকায় রোগীদের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ঝুঁকছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।”

এমন পরিস্থিতিতে বরিশাল বিভাগকে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ছানিমুক্ত’ করার লক্ষ্যে কাজ করছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা ‘দ্য ফ্রেড হলোজ ফাউন্ডেশন’। সংস্থাটির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ কে এম বদরুল হক জানান, লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে চক্ষু শিবির ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার জানান, শূন্য পদগুলোতে দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ পদায়ন করা গেলে রোগীরা স্থানীয়ভাবেই সেবা পাবেন। এতে শেবাচিমের ওপর রোগীর চাপ যেমন কমবে, তেমনি দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ভোগান্তিও নিরসন হবে।”

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ স্যারের জন্মদিনে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও সুস্বাস্থ্য কামনা

জেলা-উপজেলায় চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই: বরিশাল বিভাগের এক কোটি মানুষের ভরসা একা ‘শেবাচিম’

প্রকাশের সময় : ১২:০১:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

বরিশাল বিভাগের প্রায় এক কোটি মানুষের চোখের চিকিৎসায় একমাত্র সরকারি ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম)। বিভাগের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ না থাকায় চিকিৎসাসেবার জন্য রোগীদের ছুটে আসতে হচ্ছে বিভাগীয় শহরের এই একটিমাত্র হাসপাতালে। ফলে যাতায়াত খরচ ও সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘ অপেক্ষার চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে প্রতিবছর নতুন করে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ ছানি রোগে আক্রান্ত হন। কিন্তু শেবাচিম ছাড়া বিভাগের অন্য কোনো সরকারি হাসপাতালে চক্ষু বিশেষজ্ঞ পদায়ন না থাকায় এই বিপুলসংখ্যক রোগীর পুরো চাপ সামলাতে হচ্ছে একা শেবাচিমকে।

শেবাচিম চক্ষু বিভাগে অনুমোদিত ৬টি পদে বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন চিকিৎসক। একজন রেজিস্ট্রার ও তিনজন আউটডোর মেডিকেল অফিসারের (আইএমও) পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে কেবল একজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও একজন আইএমও দিয়ে চলছে পুরো বিভাগের চক্ষু চিকিৎসা સેવા।

প্রতিদিন ভোর থেকেই বহির্বিভাগে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পটুয়াখালী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক যুবক বলেন, “উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চক্ষু ডাক্তার থাকলে এত দূরে এসে অতিরিক্ত টাকা খরচ ও লাইনে দাঁড়িয়ে কষ্ট করতে হতো না।”

একই আক্ষেপ ৭০ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর হাওলাদারের। চোখে ঝাপসা দেখে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন তার চোখে ছানি পড়েছে। তিনি বলেন, “বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের খরচ অনেক বেশি, তাই কম খরচে চিকিৎসার আশায় শেবাচিমে এসেছি। কিন্তু এখানে এসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।”

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট ও দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক নিম্ন আয়ের রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যাচ্ছেন। চিকিৎসা নিতে আসা সাব্বির আহমেদ জানান, সরকারি হাসপাতালে সুযোগ সীমিত হওয়ায় বাধ্য হয়ে বেসরকারিতে যেতে হচ্ছে, যেখানে দ্রুত সেবা মিললেও চিকিৎসার বায়ভার সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. ডিবি পাল এ বিষয়ে বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতি থাকায় রোগীদের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে ঝুঁকছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।”

এমন পরিস্থিতিতে বরিশাল বিভাগকে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ছানিমুক্ত’ করার লক্ষ্যে কাজ করছে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা ‘দ্য ফ্রেড হলোজ ফাউন্ডেশন’। সংস্থাটির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ কে এম বদরুল হক জানান, লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে চক্ষু শিবির ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার জানান, শূন্য পদগুলোতে দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চক্ষু বিশেষজ্ঞ পদায়ন করা গেলে রোগীরা স্থানীয়ভাবেই সেবা পাবেন। এতে শেবাচিমের ওপর রোগীর চাপ যেমন কমবে, তেমনি দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ভোগান্তিও নিরসন হবে।”